বাস্তবতা অস্বীকার করার মাঝে কোন কৃতিত্ব নেই। বরং বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়ে সমাধানের পথ বের করাটা হলো উত্তম ব্যবস্থাপনার অংশ। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের যে ঘোষণা সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এই আশংকায় হাওরের বোরো ফসলহানিজনিত ক্ষয়-ক্ষতিকে সরকার অন্তত পরিসংখ্যানের আলোকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলে আমাদের কাছে মনে হয় নি। সরকারি মহল থেকে বারবার বলা হচ্ছিল হাওরের ক্ষতি সামাল দেওয়ার মতো খাদ্য মজুদ দেশে রয়েছে। এরকম অবস্থায় ভরা বোরো মৌসুমে চালের দাম ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে। সরকার বিদেশ থেকে চাল আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত হাওরের ক্ষতির পরিসংখ্যানগত দিকটি সরকার তুলে ধরে। খাদ্যমন্ত্রী শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন হাওরে ফসলহানি ও কয়েকটি জেলায় ধানের গাছে ব্লাস্ট রোগে আক্রমণের ফলে এবার বোরো মৌসুমে ২০ লাখ টন কম ধান উৎপাদন হয়েছে। তিনি বলেন, এবার বোরো মৌসুমে ৯০ লাখ মেট্টিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল কিন্তু লক্ষমাত্রার চাইতে ২০ লাখ টন ধান কম উৎপাদন হয়েছে। ২০ লাখ টন বলতে মোট লক্ষ্যমাত্রার এক পঞ্চমাংশের বেশি, শতকরা হিসাবে যা প্রায় ২২%। আমরা বলছি হাওরের বোর ধান জাতীয় উৎপাদনের ২৫%এর কম নয়। হাওরের গুরুত্ব বুঝাতে এই পরিসংখ্যানটির কোন বিকল্প নেই। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জায়গায় হাওরের এই ২৫% অবদানকে খাটো করে দেখার কোনও অবকাশ নেই। এই ২৫% ফসল যখন দুর্যোগকবলিত হয় তখন জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জায়গাটি যে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই সত্য স্বীকার করার অর্থ হলো সরকারকে হাওর বিষয়ে আরও অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। হাওরে ধান উৎপাদন খরচ সবচাইতে কম। এখানে সার বা অন্যান্য রাসায়নিকের ব্যবহার একেবারে সীমিত পর্যায়ে। তবে হাওরের ফসল প্রধানত প্রকৃতির বদান্যতার উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতির ধ্বংসলীলাকে মনুষ্যসৃষ্ট কিছু প্রপঞ্চ তরান্বিত করে যা এবারের ভয়াবহ হাওর বিপর্যয়ে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। সময় মতো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ না করা এবং ফসল রক্ষা বাঁধের বরাদ্দ লুটপাট করার অসৎ উদ্দেশ্যের কারণে এবার অধিকাংশ হাওর ডুবেছে। এই দুর্নীতির কথা সরকার মেনে নিয়ে বিভিন্ন প্রকারের তদন্ত পরিচালনা করছে। হাওরকে গুরুত্ব দিতে হলে এই দুর্নীতির উপযুক্ত বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে হাওর যাতে এমন বিপর্যয়ে না পড়ে সেই উপায় উদ্ভাবন করাটা জরুরি।
বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনের মূলে কৃষি খাত হলো সবচাইতে বড় ভূমিকা পালনকারী। শিল্প উন্নয়ন, রেমিটেন্স বা অন্য কোন প্রকারের উন্নয়নের কথা আমরা যাই বলি না কেন কৃষি ও কৃষককে উপেক্ষা করে দেশের মৌলিক ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের চিন্তা বাতুলতা মাত্র। তাই কৃষি সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে আরও প্রচুর পরিমাণে গবেষণা, প্রণোদনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। এবার অনেক দিন পর দেশে খাদ্য ঘাটতির মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের জাতীয় কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মাথায় রেখেই আমাদের কৌশলগুলো নির্ধারণ করতে হবে। এজন্য কৃষি বিষয়ক গবেষণাকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বড় বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান এবং কৃষিতে কর্পোরেট নির্ভরতা কমানো এমনসব বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে সর্বাগ্রে। বীজ, সার ও কীটনাশক এমনসব বিষয়ে এখন যে কর্পোরেট নির্ভরতা সেটি ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। এইসব জায়গায় জাতীয় সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি।

