গোলাম সরোয়ার লিটন
হাওর-বাঁওড়ের দেশ সুনামগঞ্জ। তাহিরপুরকে বলা হয় হাওরের প্রাণ। কিন্তু তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী বড়গোপ টিলায় বছরজুড়ে থাকে পানির তীব্র সংকট। এখানে এক কলস পানি ২০ টাকা এবং এক ড্রাম ( ৩৫ লিটার) পানির জন্য ১শত টাকা খরচ করতে হয় বাসিন্দাদের। যাঁদের সামর্থ্য নেই তাঁরা নিজেরাই পানি সংগ্রহ করেন। তবে পানির জন্য সবাইকে ৫শত ফুট উঁচু টিলায় ছড়িয়ে থাকা পাথরের এবড়ো-থেবড়ো পথে ওঠানামা করতে হয়। তারা পাহাড়ি ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করেন। বাসিন্দারা খাবার ও গৃহস্থালি কাজে এ পানি ব্যবহার করেন। শুষ্ক মৌসুমে ঝরনার পানি সরবহরাহ কমে যায়। আবার বর্ষায় টিলার এবড়ো-থেবড়ো পথে ওঠানামা আরো বিপদজনক হয়ে ওঠে। টিলার মাটি শুষ্ক আবার পানির ব্যবস্থাও নেই। তাই টিলায় অধিকাংশ ফসলই জন্মায় না।
এ অবস্থা তাহিরপুর উপজেলার ভারত সীমান্ত সংলগ্ন বড়গোপ টিলার ৪৩ টি পরিবারের। বড়গোপ টিলার পূর্বপাশে যাদুকাটা নদী। তবুও পানির জন্য বছরজুড়ে হাহাকার চলে ওই সকল পরিবারের দুই শতাধিক বাসিন্দার মাঝে। কয়েক যুগ ধরে এ অবস্থা চললেও টিলাবাসীর পানির সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৪২ সালে বড়গোপ টিলায় ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের বাস ছিলো। বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৩৩টি ও বাঙালি ১০টি পরিবার বাস করেন। ২০০৮ সালে বড়গোপ টিলায় একটি নলকূপ স্থাপন করলেও প্রথম থেকেই এটি অকেজো। বড়গোপ টিলা সংলগ্ন ভারত সীমান্তের মেঘালয় পাহাড়ের বাসিন্দাদের জন্য ওই রাজ্যের সরকার বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে পানির ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু মেঘালয় ঘেঁষে বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত বড়গোপ টিলার বাসিন্দারা আজো পানির সুবিধা পায়নি।
শুক্রবার বড়গোপ টিলায় গিয়ে দেখা যায় পানির জন্য সেখানে হাহাকার চলছে। শীতের সময় হলেও টিলাজুড়ে কোথায়ও শাকসব্জির এক টুকরো বাগান নেই। মনিরা আজিম শ্রমিক দিয়ে বসত ঘরের বারান্দা ঢালাই করছেন। এজন্য প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করছেন টাকা দিয়ে। ওই দিন বিকালে দেখা যায় সীমান্ত সংলগ্ন ঝরণায় স্থানীয় চাঁনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সানিকা রিচিল গোসলের জন্য মগে ঝরণার পানি তুলে বড় পাতিল ভর্তি করছেন। গোসল শেষে হাতে এক বালতি ধোয়া কাপড়, মাথায় পানি ভর্তি পাতিল নিয়ে ৫শ ফুট উঁচু টিলায় পাথর ছড়িয়ে থাকা এবড়ো-থেবড়ো খাড়াপথ হেঁটে উঠছেন। একই সময়ে দেখা হয় বড়গোপ টিলার বাসিন্দা মমতা বেগমের সাথে। তিনি মেয়ে কবিতাকে সাথে নিয়ে খাবার পানির জন্য আধা ঘন্টা হেঁটে এসেছেন বড়গোপ মাঝের টিলার সমতল ভূমিতে স্থাপিত মসজিদের নলকূপে। মমতা বেগম বলেন, স্বামী দিন মজুরী করেন। পরিবারের ৭ সদস্যের জন্য খাবার ও গৃহস্থালির পানি সংগ্রহেই আধাবেলা সময় যায়। তিনি জানান, পানি ভর্তি কলস নিয়ে টিলায় ওঠানামা অনেক কষ্ট। তবুও সময় বাঁচাতে ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও পানি ভর্তি দুইটি কলস নিয়ে টিলা বেয়ে ওপরে ওঠেন।
বড়গোপ টিলার বাসিন্দা মহিমা আজিম (৭০) বলেন, ১৯৪২ সাল থেকেই এ টিলায় বসবাস শুরু হয়। ২০০৮ সালে রোমান ক্যাথলিক চার্চে একটি নলকূপ স্থাপন করলেও পানি না আসায় প্রথম থেকেই অকেজো হয়ে আছে। টিলার বাসিন্দা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিরা আজিম বলেন, একদিকে পানির চাহিদা বাড়ছে অন্যদিকে পানি আরো দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠছে। এক কলস পানি ২০ টাকা আর ৩৫ লিটারের এক ড্রাম পানি ১শত টাকা দিয়ে সংগ্রহ করতে হয়। পানির সংকটের কারণে টিলায় শাক সব্জির চাষাবাদ করে না কেউ।
টিলার বাসিন্দা তৃপ্ত বনোয়ারী বলেন, পাহাড়ি ঝরনার পানি এখন আর ভালো নেই। ঝরনার পাশে লোকজন গরু চড়ায়। কেউ কেউ মলমুত্রও ত্যাগ করে। বর্ষায় পানি নিয়ে টিলায় ওঠানামা আরো কষ্টকর হয়ে পড়ে। আবার হেমন্তে ঝরণার পানি অনেক কমে যায়। তবুও লোকজন বাড়িতে এ পানি নিয়ে ছেঁকে খাবারের জন্য সংগ্রহ করে।
স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ওয়ালশেং রংদী জানান, টিলার অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র। দ্ইু তিনটে পরিবার টাকা দিয়ে পানি সংগ্রহ করে। আমরা বাড়তি আয়ের জন্য এ কাজ করি।
সংশ্লিষ্ট দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য স¤্রাট মিয়া বলেন, বড়গোপ টিলার ২শতাধিক বাসিন্দা পানির জন্য বছরের পর বছর কষ্ট করছেন। যেকোন উপায়ে তাঁেদর জন্য পানির ব্যবস্থা করা একান্ত দরকার।
সংশ্লিষ্ট এলাকার সংরক্ষিত নারী ইউ/পি সদস্য সুষমা জাম্বিল বলেন, ৫শত ফুট উ”ুঁ টিলায় ওঠানামা করে পানি সংগ্রহ অনেক কষ্টকর। মানবিক ও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় এখানে মোটরের সাহায্যে পানি সরবরাহ করার দাবি জানাচ্ছি।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আল আমিন বলেন, জায়গাটি সার্ভে করে বড়গোট টিলার বাসিন্দাদের পানির সংকট নিরসনে দ্রুতই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবো।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, বড়গোপ টিলায় নলকূপ বসালে পানি ওঠে না। বাসিন্দাদের পানির সংকট নিরসনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাথে আলোচনা করব।


