কেবলমাত্র প্রচলিত বেড়িবাঁধ দিয়ে হাওরের ফসল রক্ষা করা যাবে না বলেই ধারণা সকলের। পানি উন্নয়ন বোর্ড যেসব অস্থায়ী বেড়িবাঁধ দিয়ে বছর বছর সরকারের টাকার অপচয় ঘটায় সেই জায়গা থেকে সরে এসে হাওরের জন্য স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করার সময় এসেছে। হাওরকে উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই। বরং হাওরের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় আয় বাড়ানোর বহু জায়গা রয়েছে। হাওরের যে সক্ষমতা তার সামান্যতমও এখন পর্যন্ত আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। হাওর শুধু দেশের খাদ্য নিরাপত্তার শক্তিশালী ভাণ্ডারই নয় এই হাওর দেশের মিঠা পানির বৈচিত্রময় মাছেরও অনন্য ভাণ্ডার। হাওরে এখন শুধু বোরো ধানের আবাদ হয়ে থাকে। মিঠা পানির মাছ বিলুপ্তির পথে। অথচ পরিকল্পিতভাবে হাওর সম্ভাবনাকে কাজে লাগালে এই বিশাল হাওরে ধানের উৎপাদন অনেক বাড়ানো সম্ভব, এক ফসলের পরিবর্তে দুই ফসল চাষ করাও অসম্ভব নয়। আর মিঠা পানির মাছের উৎপাদন বাড়ানো তো ছিল কেবল সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আমরা মাছের দেশের মানুষ এখন দেশি জাতের মাছের জন্য হা পিত্যেশ করে মরি। অথচ হাতের কাছে থাকা হাওরকে ব্যবহার করছি না। হাওরের বড় বিপদ হলÑ অকাল বন্যা বা আকষ্মিক বন্যা যা প্রধানত উজানের পাহাড়ি ঢলের সাথে সম্পর্কিত। আমরা যেহেতু মানচিত্র বদলে ফেলতে পারব না, পারব না ভাটির দেশকে মেঘালয়—আসামের মতো পাহাড়ী করে ফেলতে তাই যেটি করতে হবে তা হলো হাওর রক্ষার বিজ্ঞানসম্মত উপায় উদ্ভাবন।
কী করে এই উপায় উদ্ভাবিত হবে তা আমরা সঠিকভাবে এই জায়গায় উপস্থাপন করতে পারব না। কারণ আমরা কেউই এ বিষয়ে অভিজ্ঞ নই। তবে কেবল অনুমান করতে পারি, স্বপ্ন দেখতে পারি, চিৎকার করতে পারি। পাহাড়ে বৃষ্টি হলে যে পানি ভাটিতে নেমে আসে তা আটকানো গেলে সমস্যার বড় সমাধান হয়ে যায়। ওই পানিকে নদী—নালা ও খাল দিয়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের দরুণ হাওরে যে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে যায় সেজন্য হাওরের ভিতর আগের মত প্রচুর নালা ও খাল তৈরি করে দিতে হবে। হাওরের গামলাকৃতি বজায় রাখতে হবে। তাহলেই হাওরে পানি জমতে পারবে না। বহুল বৃষ্টিপাতের বদলে খরাও আরেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এজন্য হাওরকে সেচসুবিধার আওতায় রাখতে হবে। নদী—নালা—খাল—বিল হয়ে উঠতে পারে সেচের পানির প্রধান উৎস।
প্রয়োজন হাওরের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করা। বাস্তবায়ন পদ্ধতি যদি গতানুগতিকভাবে দুর্নীতিপ্রবণ হয়ে উঠে তাহলে লাভের লাভ কিছুই হবে না। তাই পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। আমরা মনে করি এখনই হাওরপাড়ের মানুষের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ সংগ্রহ করে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে একটি কার্যকর রূপরেখা প্রণয়ন করা উচিৎ। হাওর শুধু ধান ও মাছের ভাণ্ডারই নয়, অনুকূল ও ভারসাম্যপূর্ণ জলবায়ু বজায় রাখতেও হাওর গুরুত্বপূর্ণ। বছর বছর অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে যে মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করা যায় না সরকারকে সেই মহাসত্য বুঝতে হবে। আর ক্ষণস্থায়ী চিন্তা—ভাবনার বদলে দীর্ঘস্থায়ী চিন্তা—ভাবনার জায়গায় উন্নয়ন ঘটাতে হবে। মনে রাখতে হবে এই গাঙ্গেয় ব—দ্বীপের যে সুজলা—সুফলা বৈশিষ্ট্য তা হাওর—বাওরই ধারণ করে। এই প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা যেকোন জাতির অপরিহার্য দায়িত্ব বটে।
আজ যখন হাওর ডুবে একের পর এক ফসল হানির নিদারুণ খবর আমাদের বুক ভেঙে দিচ্ছে তখন তাৎক্ষণিক কর্তব্যের সাথে ওই মহাকর্তব্যের জায়গায় সবচাইতে বেশি মনোযোগ দিতে হবে যাতে করে আমাদের অন্নসংস্থানকারী হাওরকে স্থায়ীভাবে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারি। মানুষ কি না পারে। মানুষই যাবতীয় প্রতিকূলতা জয় করে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম।
- বিশ্বম্ভরপুরে অপরাজিতা নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক মতবিনিময় সভা
- তাহিরপুরে একই পরিবারের ৫ জনকে কুপিয়েছে দুবৃর্ত্তরা

