শেখ রফিকুল ইসলাম
জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ
ভরা হাওর। চারদিকে চোখের সীমানা ছাড়িয়ে আরো দূরে দিগন্তে ছুঁয়েছে জলরাশি। রোদ মাখা দুপুর, লাল লাল বিকেল আর পূর্ণিমা রাত্রীতে রূপালী মাছেরা সে ঘরহীন জলরাশিতে ক্লান্তিহীন খেলা করে। ছোট ছোট গ্রাম গুলো যেন একেকটা দ্বীপের মত। সে গ্রামগুলোতে মায়ার চাদর হয়ে জড়িয়ে থাকে হিজল করচের শ্যামল ছায়া। মেঘালয় পাহাড় হয়ে নেমে আসা মেঘ জল জোছনায় মেখে ভালোবাসার টিপের মত জড়িয়ে থাকে হাওরের মাথার উপর। এই হলো হাওড় কন্যা সুনামগঞ্জ। অসিম সৌন্দর্য । অপরূপ !
কিন্তু প্রকৃতির এ রূপের আড়ালে জড়িয়ে আছে কিছু সংগ্রামী মানুষের কঠিন জীবন। বছরের ছয়মাস পানি বন্দী হাওড় এলাকার এসব মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য নিয়ত নিদারুণ সংগ্রাম করে থাকে। কিন্তু পড়াশুনার জন্য হাওড় এলাকার কোমলমতি শিশুরা যে সংগ্রাম করে, যে কষ্ট আর ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যায়, তা নজিরবিহীন। বর্ষাকালে বেশিরভাগ স্কুলগুলো পানিতে তলিয়ে যায়, অথবা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত একাকী ভেসে থাকে। সে স্কুলে যেতে ভরা হাওড়ে উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে ছোট ছোট নৌকায় করে শিশুরা স্কুলে যায়। বিদ্যার্জনের জন্য হাওড় এলাকার ছোট্ট শিশুদের যে প্রতিকুলতা এবং বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিতে হয় তা আর কোথাও দেখা যায়না। তাই এ অঞ্চলে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় তুলনামূলক বেশি।
প্রাথমিকে ঝরে পড়ার আরও কারণ রয়েছে। হাওড় এলাকার বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। অনেক বাবা-মা সন্তানদের স্কুল ছাড়িয়ে উপার্জনের জন্য বিভিন্ন কাজে লাগান। মাছ ধরা, পাথর পরিবহন, ঘর-বাড়ির নানা কাজে এসব শিশুদের ঠেলে দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা হচ্ছে অনেকটা না বুঝেই। আমি তাহিরপুর, ধর্মপাশা, বিশ্বম্ভরপুর, শাল্লা ইত্যাদি হাওড় উপজেলা সহ সবকটি উপজেলায় একাধীক মা সমাবেশ, অভিবাবক সমাবেশ, শিক্ষার মানোন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন সমাবেশে সকল অভিভাবকদের কাছে সন্তানদের স্কুল না ছাড়াতে এবং কোনরূপ পেশাভিত্তিক কাজে তাদেরকে নিয়োজিত না করতে বারবার অনুরোধ করেছি। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ যেন কোনভাবে সংঘটিত না হয় সে জন্য অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করেছি। আমরা অল্প কিছুদিনের মধ্যে সুনামগঞ্জকে বাল্য বিবাহ মুক্ত জেলা হিসেবে ঘোষণা করতে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে সবকটি উপজেলা বাল্যবিবাহ মুক্ত ঘোষিত হয়েছে । একবছর আগেও বাল্যবিবাহ একটা অভিশাপ ছিল এবং বিদ্যালয় ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
হাওড় অঞ্চলে শিক্ষক সংকট রয়েছে যা মানসম্মত শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি প্রধান অন্তরায়। শহর থেকে হাওড় এলাকায় গিয়ে শিক্ষাদানে অনেক শিক্ষকগণ উৎসাহিত হননা। তাদের অনেকেই বদলী হয়ে শহরে চলে আসেন। ফলে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করে। শিক্ষক স্বল্পতার জন্য অনেক বিদ্যালয়ে ক্লাস পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে আমরা উর্ধ্বতন মহলে পত্র যোগাযোগ করেছি। আশা করি অচিরেই এ শিক্ষক সংকট কাটিয়ে উঠা যাবে।
হাওড় অঞ্চলে শিক্ষার অন্যতম একটি প্রতিবন্ধকতা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিরামহীন বৃষ্টি, বন্যা, আগামবন্যা, বজ্রপাতসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। অনেকেই এ অনিয়মিত অবস্থা কাটিয়ে উঠে স্কুলে ফিরতে পারেনা। বন্যার সময় দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়গুলো বন্ধ রাখতে হয়। অনেক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হাওড় এলাকায় বজ্রপাতের সংখ্যা দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি। উম্মুক্ত হাওড়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেশি । বজ্রপাতের সময় শিশুদের স্কুলে পাঠানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ । এসব বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হাওড় এলাকায় বিদ্যালয় উপস্থিতির হার কমে যায়।
হাওড় এলাকায় অনেক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ঠিক নেই। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে বিদ্যুত পৌঁছায়নি । অনেক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নেই। প্রতিকুল যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এসব বিদ্যালয়ে পরিদর্শন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্তৃক ঠিকমত মনিটরিং হয়না। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আসন/বেঞ্চ নেই। কোথাও কোথাও কক্ষ সংকট রয়েছে। ইত্যাদি নানাবিধ সংকটে বিদ্যালয়ের সুষ্ঠু কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে ।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার হার ও মান বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষার জন্য একটি আনন্দদায়ক সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টিকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে গত দু বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছি। শাল্লা থেকে ধর্মপাশা পর্যন্ত ১১ টি উপজেলার কয়েক শতাধিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছি। শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা, সুধী-সমাজের সাথে কথা বলেছি। ইতোমধ্যে আমরা আমাদের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিন্হিত করে তা দূরীকরণে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা নিয়েছি। ইতোমধ্যে ঝরে পড়ার হার প্রায় ১০% প্রতিরোধে আমরা সক্ষম হয়েছি। পরপর দুটি জেলা প্রশাসক সম্মেলন ও একটি ভিডিও কনফারেন্সে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে শিক্ষার উন্নয়নে এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে নিন্মলিখিত প্রস্তাব তুলে ধরেছি ।
১) হাওড় অঞ্চলে প্রতিটি গ্রামে আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করা। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এইচ.এস.সি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাওড় অঞ্চলে আবাসিক বিদ্যালয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধীক সভা করা হয়েছে। আশা করছি খুব শীঘ্রই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে এবং হাওড় অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামে আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।
২) শিক্ষার হার বাড়ানোর জন্য এবং শতভাগ ভর্তির জন্য একধীক বিশেষ প্রকল্পচালুকরণ। বিষয়টি নিয়ে আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর পত্র যোগাযোগ করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব জনাব আবুল কালাম আজাদ এ বিষয়ে আমাদের কাজ করার নির্দেশনা দিয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। মূখ্য সচিব মহোদয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
৩) প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে বিদ্যালয় স্থাপন করা। ইতোমধ্যে “সুনামগঞ্জ অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়” নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। আর্থিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমরা যে বিদ্যালয়টি শুরু করেছি আমি আশা করি সবার সহযোগিতা নিয়ে সে বিদ্যালয়টি অচিরেই সুনামগঞ্জের অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপাঠ হিসেবে আবিভূর্ত হবে।
৪) শিক্ষক স্বল্পতা দূরীকরণে হাওড় অঞ্চলে অবস্থিত বিদ্যালয়ে বেশি করে শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করা। পদায়নের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বদলী না করা।
৫) শিক্ষকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা করা।
৬) হাওড় অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষক এবং কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রনোদনা ভাতা সহ হাওড় ভাতা প্রদান করা।
৭) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মান করা, গর্ত সৃষ্টি হওয়া মাঠগুলো ভরাট করে বাচ্চাদের খেলার উপযোগী করা।
৮) দুর্বল অবকাঠামো বিশিষ্ট বিদ্যালয়গুলো চিহ্নিত করে অবকাঠামোর উন্নয়নে কাজ করা।
৯) প্রতিটি বিদ্যালয়ে সৌর বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান।
১০) হাওড় এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইঞ্জিন নৌকা সরবরাহ করা প্রয়োজন। বর্তমানে ব্র্যাকের উদ্যোগে বেশ কটি শিক্ষা তরী চালু রয়েছে যা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। আমরা আরও ৫টি শিক্ষা তরী চালুর জন্য ব্র্যাক-কে অনুরোধ করেছি। পাশাপাশি বিদ্যালয় যাতায়াতের জন্য বড় ইঞ্জিন নৌকার ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর বরাবর পত্র যোগাযোগ হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রদত্ত আমার বক্তৃতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মুখে তুলে ধরেছি।
১১) প্রতিটি বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল এবং স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু করা। ইতোমধ্যে দু’শর বেশি বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালু হয়েছে। ধর্মপাশার ১৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৩৮০৩৯ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চলমান আছে। ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে মোট ৩২৯৭ জন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মিড-ডে মিল কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
১২) প্রতিটি উপজেলায় একাধিক শিশু কল্যাণ বিদ্যালয় স্থাপন করা। বর্তমানে সুনামগঞ্জ সদরের রাজগোবিন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে একটি শিশু কল্যাণ বিদ্যালয় পরিচালিত হয়। পুরাতন জেলখানা ভবনের সম্মুখে আরও একটি বিদ্যালয় চালুর জন্য ইতোমধ্যে আমরা শিশু কল্যান ট্রাস্ট-এর সাথে যোগাযোগ করেছি। পর্যায়ক্রমে আমরা প্রতিটি উপজেলায় শিশু কল্যাণ বিদ্যালয় স্থাপন করতে পারব বলে আশা করি।
পরিশেষে বলতে চাই, হাওড় বেষ্টিত সুনামগঞ্জে শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে অনেক কিন্তু সকলে একসাথে মিলে কাজ করলে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে এখানে শিক্ষার হার শতভাগে উন্নীত করা অসম্ভব নয়। সমানিত পাঠকগণ জেনে খুশি হবেন যে গত দুবছরে আমাদের গৃহীত নানা পদক্ষেপে ঝরে পড়ার হার কমেছে প্রায় ১০%। আমাদের লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা। গত কয়েকবছরে তথ্য ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে সবখানে। হাওড় অঞ্চলের আপাত পশ্চাদপদ জনগণকে উন্নয়নের কাতারে নিয়ে আসা খুব শীঘ্রই সম্ভব হবে বলে আমি আশা করি। এর জন্য প্রধান শর্ত হচ্ছে এ পশ্চাদপদ জনপদকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা। সে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমি সবার সহযোগিতা চাই। আমি হাওড় অঞ্চলে শতভাগ শিক্ষা নিশ্চিতে একটি আন্দোলনের সূচনা করেছি। এ আন্দোলনে সুনামগঞ্জের প্রতিটি মানুষ আমার সাথে থাকবেন বলে আমি আশা করি। আমাদের শ্লোগান ছড়িয়ে যাক সুনামগঞ্জ সহ সমগ্র বাংলাদেশ জুড়েঃ
“স্কুলে বিদ্যার্জন, মঞ্চে গান
মাঠে খেলাধুলা, জমিতে ধান”
অনুলিখনঃ মনিরুল হাসান, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট


