বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি হওয়া রোগীদের খাবার প্রদানে অবহেলা আছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। সিভিল সার্জন অবশ্য শনিবার বিকালে বলেছেন, তিনদিন হয় রোগীরা ভাল খাবার পাচ্ছেন, মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে, করোনা রোগীদের বরাদ্দ অনুযায়ী খাবার নিশ্চিত করা হবে।
উজান তাহিরপুরের সোজা উদ্দিন করোনায় আক্রান্ত হয়ে তাহিরপুর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অন্যান্য রোগীদের মত তিনিও ছিলেন করোনা ইউনিটে। প্রথম দুই দিন তাকেসহ করোনা ইউনিটের রোগীদের সকালে ২ টা রুটি ও সামান্য একটু ডাল দেওয়া হয়েছে। দুপুরে সামান্য একটু পাঙ্গাস মাছ, ঝোল ও ভাত জুটেছে তাদের। রাতেও একই খাবার। সোজা উদ্দিন বললেন, দুইদিন পর (৩০ জুলাই) একজন সাংবাদিক রোগী হয়ে আসলে আমাদের ভাগ্য ফিরে। সকালে একটা আপেল, এক বোতল পানি ও একটা ডিম অতিরিক্ত পাই আমরা। দুপুরে ও রাতে আগের চেয়ে কিছু ভালো খাবার পাই।
একইভাবে উপজেলার গোলকপুরের আলমগীর হোসেন তার ৮০ বছর বয়সী করোনা আক্রান্ত বাবা আমরাম উদ্দিনকে নিয়ে ৮ দিন ছিলেন তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২০ শয্যার করোনা ইউনিটে। আলমগীর বললেন, সাধারণ রোগীদের যে খাবার দেওয়া হয়, ওই একই খাবার দেওয়া হয়েছে আমার বাবাকে। ২৯ তারিখ একজন সাংবাদিক ভর্তি হন হাসপাতালে। তিনি বিষয়টি আরেকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে দিয়ে সিভিল সার্জনকে জানান। এরপর ৩০ তারিখে (৩০ জুলাইয়ে) খাবারের সামান্য পরিবর্তন হয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মী সাঈদুর রহমান আসাদ ২৯ জুলাই করোনা আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন তাহিরপুর উপজেলা হাসপাতালের করোনা ইউনিটে। শনিবার তিনি বাড়ি চলে এসেছেন। তিনি বললেন, হাসপাতালে অস্বাস্থকর পরিবেশতো আছেই, খাবার নি¤œমানের দেখে খাবার সরবরাহকারী সাদ্দাম হোসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সাধারণ রোগী আর করোনা রোগীর এক ধরনের খাবার কেন ভাই। তিনি জানালেন, এখানে এক ধরনের খাবারই দেওয়াই হয়।
আসাদ জানালেন, তিনি সাদ্দাম হোসেনকে বললেন, করোনা ইউনিটের রোগীর জন্য দিনে ৩০০ টাকা এবং সাধারণ রোগীর জন্য ১২৫ টাকা বরাদ্দ, এটি তিনি জানেন কি-না, উত্তরে সাদ্দাম বললেন, এটা তার জানা নেই। তারা সকলকে একভাবেই খাবার দেন।
এই বিষয়টি জানার জন্য সাদ্দাম হোসেনের মুঠোফোনে ফোন দিলেন, একজন মহিলা ফোন রিসিভ করে জানালেন, সাদ্দাম ফোন মেসে রেখে বাইরে আছে।
সুনামগঞ্জ জেলা সদরের বাইরে শুক্রবার পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি ছিলেন তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ওখানে স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী শুক্রবার ১১ জন করোনা রোগী ছিলেন। অন্য হাসপাতালগুলোর মধ্যে বিশ^ম্ভরপুরে দুই, জামালগঞ্জে নয়, জগন্নাথপুরে দুই এবং শাল্লায় চার করোনা রোগী ভর্তি ছিলেন। তাহিরপুর হাসপাতালের দায়িত্বশীলরা বুধবার পর্যন্ত জানতেন না, করোনা রোগীর খাবারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, করোনা রোগীর খাবারের মান নিয়ে জেলার অন্য হাসপাতালগুলোতেও অবহেলা আছে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের একজন ডাক্তার (পরিচয় প্রকাশে অসম্মতি আছে) বললেন, দায়িত্বশীলদের ব্যস্ততার সুযোগ নিচ্ছে ডায়েট সরবরাহকারী। তারা স্বাভাবিক অবস্থায় যেভাবে খাবার দেয়, করোনা রোগীদের সেভাবে খাবার দিয়ে টাকা হাতানোর ধান্দায় আছে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ১০০ শয্যার করোনা ইউনিট। গেল এক সপ্তাহ হয় প্রতিদিন ৩০-৩৫ জন রোগী থাকে ওখানে। শুক্রবারও ৩৭ জন করোনা রোগী ভর্তি ছিল এখানে। এই হাসপাতাল থেকে গত ২৫ জুলাই বিদায় নেওয়া রোগীর ভাই শহরের ষোলঘরের আলী সিদ্দিক বললেন, ভর্তি থাকাকালে তার ভাইকে, সকালে একটা ডিম, সামান্য খিচুরি দেওয়া হয়েছে। দুপুরে ভাতের সঙ্গে ছোট এক পিস মাছ, সামান্য সবজি এবং রাতে ভাতের সঙ্গে ঝুলসহ এক পিস মুরগির মাংস ও সামান্য সবজি দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের খাবারের মান নিয়ে তিনিও প্রশ্ন তুলে বললেন, আমরা বাড়ি থেকেই খাবার এনেছি, তার মতে হাসপাতালের তিন বেলা দেওয়া খাবার হোটেলে খেতেও দিনে ১৪০- ১৫০ টাকার বেশি লাগবে না।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা আবু আহমেদ শাফি বললেন, ডায়েট দিতে ঠিকাদাররা সব সময়ই ঝামেলা করে। করোনা রোগীদের আলাদা করে খাবার দেবার বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। বৃহস্পতিবার থেকে সেটা ঠিক হয়েছে। এখন থেকে ঠিক থাকবে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. আনিসুল হক বললেন, করোনা ইউনিটে খাবার সঠিকভাবে যাতে হয়, কাল থেকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখবো আমরা। অবহেলার কথা জানানোয় তিনি এই প্রতিবেদককে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসককে বিষয়টি বলে দেওয়া হবে। খাবারের মান এবং বরাদ্দ টাকা মোতাবেক যাতে খাবার পায় রোগীরা সেটি নিশ্চিত করা হবে।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শামস উদ্দিন বললেন, করোনা ইউনিটে আলাদা খাবার দেবার বিষয়টি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তারা কনফিউসনে ছিলেন। তারা বুঝতে পারেননি বিষয়টি। এজন্য আলাদা বাজেট আছে, বিল দেওয়া হবে সেটি জানিয়ে দিয়েছি আমি। বৃহস্পতিবার থেকে রোগীরা খাবার পাচ্ছে, এখন আর সমস্যা হবে না। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের বিষয়টি মনিটরিংয়ে রাখতে বলা হয়েছে।


