বিশ্বজিত রায়
চারপাশে কুয়াশা কুকড়ানো ভাব। তেজহীন সূর্যের আলসেমী অঙ্গে নেই সোনালী ঝাঁজ। কুয়াশা ভেদ করে প্রকৃতিতে আছড়ে পড়া সূর্যের মৃদু আলোয় বিরাজ করছে নিস্তেজতা। গুমোটবাধা ধুয়াশাচ্ছন্ন কুয়াশা সরিয়ে সূর্য তার স্বাভাবিক আলোকোজ্জ্বল আভা প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেকটা শক্তিহীন হয়ে পড়ছে। শীতশূন্য প্রকৃতিতে শৈত্যপ্রবাহের আচমকা আক্রমন সতেজ সূর্যের তেজোদ্দীপ্ত সামর্থ্য কেড়ে নিয়েছে প্রভলভাবে। বাতাসে হিম আধিক্য ও কুয়াশা ঢাকা দূরের বাড়ি-ঘর, পথঘাট, মাঠ-ময়দানে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না সূর্যের চকচকে উত্তাপ। মিষ্টি রোদের পরিবর্তে বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশে ঝেঁকে বসেছে শৈত্য শীতলতা। ঠা-ার এই কনকনে কোমলতায় কাঁপছে সারাদেশ। শীতের শক্ত ধাক্কায় জবুথবু শহর-বন্দর, গ্রামগঞ্জ ও ক্ষেতখামারে কর্মরত মানুষ। হাড়কাঁপুনি ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়েছে পশু-পাখি তথা পুরো প্রাণীজগৎ।
শীতের তীব্রতা কতটা অস্বস্তিদায়ক তা ঘরে বসেও টের পাওয়া যাচ্ছে। খবরের কাগজে উঠে আসা সংবাদ বলছে, সারাদেশে জেঁকে বসেছে শীত। বইছে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ। উত্তরের জনজীবন কাহিল হয়ে পড়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও শীতের প্রকোপ বেড়ে গেছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে মৌসুমের প্রথমবারের মতো সর্বনি¤œ তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গায় ৬.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। এদিন ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১০.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। অন্য বিভাগীয় শহরের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা কমে গেছে। এই অবস্থা আরও কয়েকদিন চলতে পারে বলে জানা গেছে। ঋতু বৈচিত্রের হিসাব অনুযায়ী এ দেশে শীত নামে ডিসেম্বরের শেষ থেকেই। তবে এ বছর শুরু থেকেই শীতের বৈচিত্রহীন ভাব পরিলক্ষিত। গত ২৩ নবেম্বর থেকে দেশের উপর দিয়ে শীতল হাওয়া বইতে থাকলে একদিন পরেই তা কেটে যায়। মাঝে দুই দফায় লঘুচাপ এবং নি¤œচাপের প্রভাবে শীত উধাও হয়ে যায়। মধ্য ডিসেম্বর থেকে কখনও শীত আছে তো নেই, এই অবস্থা চলছিল। গত ৪ জানুয়ারি থেকেই হঠাৎ করেই জেঁকে বসেছে শীত। অবশ্য দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছুদিন ধরেই শীতের প্রকোপ বাড়ছিল।
শীত শুধু বাংলাদেশকে চেপে ধরেছে তা নয়। একের পর এক শীতকালীন ঝড়ে রীতিমতো কাবু হয়ে পড়েছে ইউরোপ ও আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর পূর্ব অঞ্চলে চলতি সপ্তাহে আরো শক্তিশালী তুষার ঝড় আঘাত হানবে বলে জানানো হয়েছে। এই ঝড়কে মার্কিন আবহাওয়াবিদরা ‘বোম্ব সাইক্লোন’ বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছেন হারিকেনের বেগে বয়ে যাওয়া বাতাসের তোড়ে তুষারে ঢেকে যাবে বিস্তীর্ণ এলাকা। ফলে হাড় হিম করা ঠান্ডায় ভুগবে মানুষ। ইউরোপ আমেরিকার মানুষেরা শীতের সাথে সর্বদা যুদ্ধ করেই বেঁচে থাকে। তবে বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। এ দেশের মানুষ শীতের তীব্রতায় অনেকটা নাজেহাল হয়ে পড়ে।
শীতহীন বঙ্গে প্রবল প্রতাপে এসেছে শীত। শীত নেই শীত নেই বলে লোকমুখে সর্বত্র সুর উঠলে আচমকা ধেয়ে আসে শৈত্যপ্রবাহ। উত্তরের হিম হাওয়ায় ভর করে বাংলার গদীতে চেপে বসা শীতের চোখ রাঙানিতে মাটি-মানুষ, তরুলতা ও বৃক্ষরাজিসহ সর্বত্র এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। স্বাভাবিক জীবনযাপনেও পড়েছে এর প্রভাব। ঠান্ডাজাতীয় রোগ-ব্যাধিতে সংক্রমিত হওয়ার মারাত্বক শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত ঠান্ডা শিশু ও বয়স্ক মানুষের জন্য ডেকে আনছে বিপদ বার্তা। এছাড়া এ সময়টায় গৃহপালিত পশু গরু, ছাগল, ভেড়া ও হাঁস-মুরগী নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শীতে সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখোমুখী হবে মানুষ। সমাজের খেটে খাওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ছিন্নমুল মানুষেরা মারাত্বক সঙ্কটকাল অতিক্রম করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষেরা দামি কাপড়ে শীত নিবারণ করলেও নি¤œবিত্ত মানুষগুলো ঠা-ার ত্যাক্ত তিরস্কারে ভোগান্তির চরম বাস্তবতা উপলব্ধি করবে বৈকি। বিশেষ করে শহরের পথেঘাটে বেড়ে ওঠা টোকাই শ্রেণি ও গ্রামের গরীব দিন আনে দিন খায় পরিবারের নিরুপায় জনমানুষ শীতের এই বিরক্তিকর বিমর্ষতায় দিন কাটাবে। এদের জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের পর্যাপ্ত সহায়তা। এর জন্য সরকার ও বিত্তশালী মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজে সর্বাগ্রে পিছিয়ে পড়া এই মানুষগুলোকে একটু প্রশান্তি দিতে সকলের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। সবার সুশৃঙ্খল সহায়তা হয়তো শীতের কঠিন কামড় থেকে রক্ষা পাবে ওই গরীব-অসহায় মানুষগুলো।
ঋতু পরিক্রমায় পৌষ-মাঘ দুইয়ে মিলে শীতকাল। কিন্তু শীতসারথি পৌষের মাঝামাঝিতেও ছিল না শীতের দেখা। ছয়টি চক্রাকারে আবর্তিত ঋতুর ছয়টি ধারা বঙ্গ বাস্তবতায় পুরোপুরী পাল্টে গেছে। ঋতু পরিবর্তনের রেশ বজায় রেখে যখন যা হওয়ার কথা ছিলো তা হচ্ছে না। প্রকৃতি বিরুদ্ধাচরণের ফলে শীতে গরম অনুভূত হচ্ছে আর গরমে ঝাপটে ধরছে শীত। বর্ষায় নেই প্রকৃত বর্ষা। চৈতের ভরদুপুরে নামছে ভারি বর্ষণ-বজ্রপাত, ডুবে যাচ্ছে হাওর-বাওর, নদীনালা, খাল-বিল। প্রকৃতির এই বেহিসেবি খেলায় বিপর্যস্ত ভূম-ল ঋতুচক্রের নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখার প্রার্থনায় সর্বদা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জীবজগতের বিশাল ভার বয়ে চলা ভূম-লের প্রাণভরা আকুতিকে পাশ কাটিয়ে ভূপ্রকৃতি যেন জীঘাংসা মেটানোর প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ঋতু পরিবর্তনের প্রতিটি কালে প্রকৃতির বৈরি আচরণ মানুষকে যেমন বিপদের সম্মুখীন করছে তেমনি বাসোপযোগী পৃথিবীকে বারবার বিপদাপন্ন পথে ঠেলে দিচ্ছে। প্রকৃতির বদান্যতায় বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে ওঠা পৃথিবী আজ এই প্রকৃতি দ্বারাই বিপন্ন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।
বিদঘুটে প্রকৃতির যখন তখন ক্ষেপে যাওয়া কারণ খোঁজতে গেলে সামনে চলে আসবে মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণ। আজ আমরা প্রকৃতিগত যে দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছি তার জন্য সম্ভবত প্রধানতম দায়ী মানুষ। সৃষ্টির সেরা এই মানুষই প্রকৃতিকে ক্ষেপিয়ে তুলছে বারবার। যদি প্রশ্ন করেন কিভাবে, কেমন করে? তাহলে বলব- মানুষ হিসেবে একবার কল্পনা করুন, এই এক যুগ আগেও আপনার চারপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ কেমন ছিল। লক্ষ করুন পরিত্যক্ত জায়গায় গজিয়ে ওঠা ঝোপজাড়, বনজঙ্গল, তরুলতা কেটে উজাড় করা হচ্ছে কি না। যেখানে ছিল ঘোর বনাঞ্চল সেখানে আজ মানুষের আবাসস্থল। মনুষ্য প্রয়োজনে বনবাদাড় ধ্বংস থেকে শুরু করে নদীনালা, খাল-বিল, পুকুর ভরাট সবই হচ্ছে মানুষের হাত ধরে। প্রকৃতি সহায়ক গভীর অরণ্য চলে যাচ্ছে বাসা-বাড়ির দখলে। এছাড়া নদনদী ও ডোবানালা দখল করে গড়া হচ্ছে শিল্পাঞ্চল সুরম্য অট্টালিকা। মানুষ কর্তৃক এসব জোরজবরদস্তি প্রকৃতি সয়ে যাচ্ছে নিরবে। আর সুযোগ পেলেই প্রকৃতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছে। ঋতু বৈচিত্র্যতায় পড়ছে এর মারাত্বক প্রভাব।
প্রকৃতির বৈরি বিরুদ্ধাচরণ চলছে এবং চলবে। মনুষ্য আঘাতে জর্জরিত প্রকৃতি যেন আজ নিরুপায়। ভারসাম্যহীন প্রকৃতি তাই অবেলা অসময়ে খড়া-শিলা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বৃষ্টি-বজ্রপাতের মতো মরণঘাতি দুর্যোগে সওয়ার হয়ে নিজেকে রক্ষার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির অস্বাভাবিক আচরণ বদলে দিচ্ছে বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশের ঋতু পরিক্রমার রীতিনীতি। এর অন্যতম কারণ প্রকৃতির প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব। আমরা মনুষ্য জাতি প্রকৃতিবিনাশী এমন কোনো অপকর্ম বাকি নেই যা আমাদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে পারি আমার দেখা বৃক্ষরাজিতে পূর্ণ একটি সবুজাব প্রান্তরের তরতাজা স্মৃতি।
আমার জন্মভিটে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলাধীন বেহেলী ইউনিয়নস্থ রহিমাপুরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা সদ্যবিলুপ্ত হিজল-করচের কথা না বললেই নয়। এইতো পনেরো-বিশ বছর আগেও সেখানে ছিল সবুজের সমারোহ। ধানী জমির কান্দা পারে গজিয়ে ওঠা হিজল-করচ, বেত-বিন্না ও লতাপাতায় আচ্ছাদিত গোচারণ ভূমিটুকু যেন আজ অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে নেই প্রকৃতি সহায়ক কোনো চিহ্ন, নেই পাখিপালের উড়াউড়ি, নেই পক্ষীকূজন। অনিন্দ্য সুন্দর এই হিজল-করচের বাগান কেটে ধ্বংস করা হয়েছে। সেখান থেকে হারিয়ে গেছে প্রকৃতিবান্ধব সকল বস্তু। হাওর পারের গর্বিত প্রতীক হিজল-করচার এই মনোরম দৃশ্যপট এখন কেবল স্মৃতি। শুধুমাত্র মানুষের বেহিসেবি আচরণে আজ বিলুপ্ত প্রকৃতিসৃষ্ট সেই বাগান।
দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই এভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে বন-বনাঞ্চল। যার খেসারত হিসেবে আমরা পাচ্ছি প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট নানা দুর্যোগ। যে দুর্যোগে কেঁপে উঠছে পৃথিবীর কোনো না কোনো অংশ। প্রকৃতির অস্বাভাবিক গতিবিধি মানুষকে দুর্ভোগ-দুর্গতি ও ভোগান্তির চরম পর্যায়ে নিয়ে দাঁড় করাচ্ছে। এ থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে মানুষ আরো বিধ্বংসী রূপ ধারণ করছে। মানুষকে পাল্টাতে হবে এই প্রকৃতিবিনাশী মনোভাব। প্রকৃতি সহায়ক প্রকৃত বন্ধু হিসেবে মানুষ নিজেদের গড়ে তুলবে এটাই কাম্য। সবশেষে বলব কেটে যাক কুয়াশা, কেটে যাক শীত, ফিরে আসুক প্রশান্তির ছায়া।
লেখক: কলামিস্ট


