আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের স্বভাবে সহজে পেয়ে যাওয়ার একটি তাড়না কাজ করে। সহজে টাকা কামাতে চায়, সস্তায় জিনিস কিনতে চায়। আমাদের অধিকাংশ মানুষ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয়। অসম ব্যবস্থার কারণে সম্পদের বৈষম্য প্রকট। পাশের বাড়ির ধনি মানুষটির সাথে অন্যজনের সম্পদের ব্যবধান আকাশ—পাতাল। প্রতিবেশী ধনি ব্যক্তির ঠাটবাট, দম্ভ ও প্রাচুর্য দেখে অনেকেই ঈর্ষান্বিত হন। নিজেকে বঞ্চিত ভাবেন। এই হীনমন্যতা থেকে ভিতরে জন্ম নেয় লোভ। আর এই লোভই ডেকে আনে সহজে সবকিছু পেয়ে যাওয়ার এক উদগ্র বাসনা। এরই বহিঃপ্রকাশ দেখি ডেসটিনি, ইভ্যালি বা এমন ধরনের ঠকবাজ প্রতিষ্ঠানের চমক জাগানো বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং, শেয়ার বাজার, লটারি, অনলাইনভিত্তিক নানা ধরনের জুয়ায় টাকা বিনিয়োগ করেন অনেকে ে¯্রফ পাঁচ গুণ দশ গুণ টাকা কামাই করার ধান্দায় অথবা প্রকৃত দামের এক চতুর্থাংশ দামে জিনিস কিনতে। সবকিছু খুয়ানোর পর এই শ্রেণির মানুষ বুঝতে পারে তারা মূলত সোনার হরিনের পিছনে ছুটে সর্বস্ব খুইয়েছে। তখন আর করার কিছু থাকে না। ঠকবাজরা ততক্ষণে পগার পাড় হয়ে পড়ে। হিনবিত্ত বাঙালি মননের এই সমীকরণটি বেশ ভাল বুঝে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী বা প্রতারক। এরা প্রলোভনের ফাঁদ পেতে রাখে লোভাতুর মানুষ ধরার জন্য। এরকমই চটকদার একটি বিষয় হচ্ছে হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য বিক্রির ঘোষণা। এখন বহু দোকানের সামনে ব্যানার টানানো দেখা যায়- ৫০ ভাগ ৮০ ভাগ হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। সস্তা কিনতে গিয়ে ক্রেতারা মূল দামের চাইতেও বেশি টাকা দিয়ে আসছেন সেটি টেরও পাচ্ছেন না। রমরমা এই বাণিজ্যিক প্রতারণাটি এবারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নজরে পড়েছে। দেশব্যাপী এমনভাবে বিজ্ঞাপিত পণ্যের ভিতরের খবর বেরিয়ে আসছে একে একে। বাদ যায়নি আমাদের ছোট্ট জেলা শহরটিও। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের এক অভিযানে বাটা শোরুম ও নোঙর নামের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে দামের স্টিকার টেম্পারিং করার দায়ে জরিমানা করা হয়েছে।
ঢাকায় পরিচালিত এরকম অভিযানের সংবাদ থেকে জানা যায়, ৫০% মূল্য হ্রাসের ঘোষণা দিয়ে যে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে আদতে সেখানে কোন ছাড় দেয়া হচ্ছে না বরং মূল দামের চাইতে বেশি রাখা হচ্ছে। যেমন একটি পাঞ্জাবির গায়ে দামের স্টিকার লাগানো আছে ২৭৯০ টাকা। ওই পণ্যটি ৫০% ছাড়ে বিক্রির ঘোষণা দেয়া আছে। ক্রেতারা খুশি মনে দলে দলে এই ধরনের পাঞ্জাবি কিনছেন ৫০ ভাগ হ্রাসকৃত মূল্য ১৩৯৫ টাকায়। এবার আসল ঘটনা জানা যাক। অভিযানের সময় পাওয়া গেলো নতুন স্টিকারের নিচে আরেকটি স্টিকারের অস্তিত্ব। সেই স্টিাকারে দাম লিখা ১১৯০ টাকা। তাহলে কী হলো? ৫০ ভাগ কমে যারা জিনিস কিনে তৃপ্তির ঢেকুর দিচ্ছেন তারা মূলত প্রকৃত দামের চাইতেও (এটিও প্রকৃত কি না কে জানে) ২০৫ টাকা বেশি দিলেন। এই অতিরিক্ত টাকাটি হন্যে হওয়া ক্রেতার আক্কেল সেলামী। এইভাবে আমাদের বাজার ব্যবস্থায় প্রতারণার কী পরিমাণ জাল পেতে রাখা হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আর আমাদের বাজার ব্যবস্থার মতো স্বাধীন, বেপরোয়া, ক্রেতাবিদ্বেষী, অনৈতিক ব্যবস্থা সম্ভবত সভ্য দেশগুলোতে চিন্তাও করা যায় না।
অবাক লাগে বাটার মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শোরুমেও এমন অনৈতিক ঘটনা ঘটে থাকে। তাহলে আমাদের বিশ্বাসের জায়গাটা থাকবে কোথায়? বিভিন্ন ব্র্যান্ড নামের পণ্য মানুষ একটু বেশি দামে কিনেই না ঠকার জন্য। অথচ হাতের কাছেই প্রমাণ মিলল নামী—দামী ব্র্যান্ডগুলোও আজ বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। এইসব মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ বাজার নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত সকলের আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন। আর ক্রেতাদের সাবধান হতে হবে। সস্তায় কিনে পস্তানোর বদভ্যাস ত্যাগ করে নিজের বুদ্ধি বিবেচনা প্রয়োগ করার সামর্থ অর্জন করতে হবে।

