কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রদর্শন ভিত্তিক শিখন কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম। পুঁথি ও বক্তৃতাকেন্দ্রিক শিক্ষা দানের সাথে প্রদর্শন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গভীরে যেয়ে বুঝার সুযোগ পায়। তাই আধুনিক শিক্ষা দান ক্ষেত্রে পঠন-পাঠনের সহায়ক হিসাবে প্রদর্শনের বিষয়টিকে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নে শিক্ষা দানের জন্য প্রদর্শনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাচীন ইতিহাস, রাজনীতি-অর্থনীতি, কৃষি ও স্থাপত্য, সাহিত্য ও কলাশাস্ত্র; প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তব ধারণা দিতে প্রাচীন স্থাপনাসমূহে নিয়ে যেত। বিপ্লব পূর্ব রাশিয়ার সমস্ত ঐতিহাসিক স্থাপনা তারা বিশেষভাবে সংরক্ষণ ও মিউজিয়ামে রূপান্তর করে এগুলোকে শিক্ষাদান কাজের অংশে পরিণত করে নিয়েছিল। এর সুফলও তারা হাতে হাতে পেয়েছিল। শিক্ষার্থী অধীত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের সাথে যখন এর বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন দেখতে পায় তখন ওই জ্ঞান তার মনের গভীরে গেঁথে যায়। যেমন ইতিহাস পড়ানোর সময় গাদা গাদা বই মুখস্ত করানোর চাইতে ঐতিহাসিক জায়গা ও স্থাপনা দেখানো ও গল্পচ্ছলে এর ইতিহাস জানানোর মাধ্যমে আনন্দদায়ক শিখন কার্যক্রম সহজেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। বলা যেতে পারে দেখে দেখে শিখার চাইতে আনন্দদায়ক আর কিছু হতে পারে না। ডালিম গাছ কেমন তা কথা দিয়ে বুঝাতে যতটা কষ্টকর বাস্তবে একটি ডালিম গাছ দেখিয়ে দিলে তা অনেক সহজ হয়ে যায় না কি? এত কথার আসর বসানো হল মূলত সোমবারের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের একটি সংবাদকে উপলক্ষ করে। ‘শান্তিগঞ্জে ১৭ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই শহিদ মিনার’ শিরোনামের ওই সংবাদটিতে বর্নিত উপজেলার যেসব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শহিদ মিনার নেই তাদের নাম উল্লেখিত রয়েছে। বলাবাহুল্য সারা দেশে শহিদ মিনার না থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি হবে। হালআমলে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যেমন বহুতল ভবনের একতলায় দর্জির দোকান আর দু’তলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠছে সেগুলো হিসাবের মধ্যেই আনার দরকার নেই।
আমাদের দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম আর বীরত্বগাঁথার বর্ণময় নানা ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকের স্তরে স্তরে সাজানো আছে। শ্রেণিকক্ষে সেগুলো পড়ান্ োহোক বা না হোক শিক্ষার্থীদের এসবের পরীক্ষা দিতে হয়। শিক্ষার্থীরা মুখস্ত করে পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফলে বিষয়ের গভীরে পৌঁছানো সম্ভব হয় না তাদের। দরকার ছিল পাঠ-বিষয়ের সাথে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট ধারণা দান করা। যেমন সুমহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানাতে চাইলে শহিদ মিনারের চাইতে উত্তম জায়গা আর কি হতে পারে। একুশের দিনে শিক্ষার্থীরা যখন ওখানে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য যাবে তখন তাদের মনে প্রশ্নের উদয় হবেÑ কেন এই শ্রদ্ধা নিবেদন? কী হয়েছিল ওই দিন? এসব প্রশ্ন তৈরির মধ্য দিয়েই তাদের জানার আগ্রহ তৈরি হবে। কিন্তু যদি শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা নিবেদনের কোন সুযোগই না পায় তাহলে তাদের জানার পথ উন্মুক্ত হবে কী করে? এরকম অবস্থা সব ক্ষেত্রেই। আমরা শিক্ষার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের কোন্ উন্নতি করতে চাই তা আজ আর স্পষ্ট নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই দেশের স্বর্ণালী ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষভাবে অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে। আমরা শুনেছি বিজ্ঞান শিক্ষা দানের ক্ষেত্রেও সম্প্রতি প্রদর্শনী ও বাস্তব অনুশীলনের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত রয়েছে। অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ আসলেও সারা বছরে একদিনও এসবের সাথে শিক্ষার্থীদের সংযোগ স্থাপিত হয় না, এমন অভিযোগ বিস্তর। এমন পরিকল্পনা ও লক্ষহীন শিক্ষা কার্যক্রমের ফলে আমরা একটি মেধাহীন প্রজন্ম তৈরি করে চলেছি না কি?
যাহোক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতে শহিদমিনার স্থাপিত হয় এবং জাতীয় ও উল্লেখযোগ্য দিবসসমূহ আন্তরিকতার সাথে পালন করা হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যমান ঐতিহাসিক উপাদান, স্থাপনা ও ব্যক্তিত্বদের সাথে সংযোগ করে দিয়ে তাদের জানার পরিধিকে বিস্তৃত করার সুযোগ করে দিতে হবে।

