২১ ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়ে কয়েকটি কথা

জাতীয়ভাবে চতুর্থ ধাপ আর জেলার তৃতীয় ধাপে রবিবার তিন উপজেলার ২১ ইউনিয়নে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগের দুই ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়েও তেমন কোন অভিযোগ ছিল না। বস্তুত সারা দেশেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একটি ভাল নির্বাচনী সংস্কৃতি আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে যে বাক্য-বাহাস হয়ে চলেছে চলমান ইউপি নির্বাচন এর সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র বহন করছে। নির্বাচনের এই সংস্কৃতি সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বজায় থাকলে দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি অনেক মজবুত হবে নিঃসন্দেহে।
রবিবার শেষ হওয়া ২১ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে সরচাইতে বেশি আলোচিত বিষয় হল- আগের ধারা বজায় রেখে আওয়ামী প্রার্থীদের ভাল ফলাফল করতে না পারা। ২১ ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র ৭টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পেরেছেন। অর্থাৎ মাত্র এক তৃতীয়াংশ আসনে সরকার দলীয় প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের এমন ভরাডুবি নিয়েই এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। আওয়ামী লীগের পক্ষাবলম্বনকারী মহল থেকে বলা হচ্ছে, নৌকার প্রার্থী কম জিতলেও আওয়ামী ঘরানার প্রার্থী জিতেছেন আরও অনেকে। তাদের বলার আরও বিষয় হল- প্রতিটি ইউনিয়নে আওয়ামী প্রার্থীর সাথে স্বদলীয় আরও এক বা একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ফলাফলের এমন বিপর্যয় ঘটেছে। তাদের এই বক্তব্য আংশিক সত্য। আওয়ামী লীগের মূল প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে প্রদত্ত ভোটের বেশির ভাগই ঢুকেছে তাদের বাক্সে। কিন্তু কথা এটি নয়। কথা হলো- আওয়ামী লীগ কেন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে দক্ষ ব্যবস্থ্পানার পরিচয় দিতে পারল না। আওয়ামী লীগের মত বড় দলে যোগ্য প্রার্থীর অভাব থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। অনেকে মনোনয়ন চাইবেন। কিন্তু চূড়ান্তভাবে মনোনয়ন পাবেন একজন। বাকিদের দল মনোনীত প্রার্থীর সমর্থনে নিজেদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার কথা। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার এই নিয়ম। কিন্তু আমরা অবাক বিম্ময়ে লক্ষ করলাম, মনোনয়ন চাওয়া প্রার্থীদের বড় অংশই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন না। তারা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থেকে গেলেন স্বতন্ত্র পরিচয়ে যাদের আমরা বিদ্রোহী প্রার্থী বলি। এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের থামাতে পারলে এবং পুরো দল এক হয়ে কাজ করলে নির্বাচনের ফল তাদের জন্য আরও ভাল হত অবশ্যই। দলীয় সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রতি সীমাহীন উপেক্ষা দেখানোকে থামাতে না পারা দলটির বড় ব্যর্থতা। এই জায়গাই আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটেছে বলে আমরা মনে করি।
নির্বাচনে বিএনপির ৩ ও জাতীয় পার্টির ১ প্রার্থীর বিজয়ী হওয়াটা আরেক উল্লেখযোগ্য দিক। বিএনপি কাগজেপত্রে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রায় শতভাগ অংশগ্রহণ করছে। প্রতিটি ধাপেই তাদের বেশ কয়েকজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক না হোক কৌশলগতভাবে স্বতন্ত্র পরিচয়ে বিএনপি প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করেছে বলে আমরা মনে করি। সামনের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির এমন নমনীয় ও সুবিবেচক অবস্থা বজায় থাকলে দেশের মানুষ খুশি হবে। বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে একটা বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তির উপর দাঁড় করানো এই সময়ের সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিশ্বাস কেবল গড়ে উঠতে পারে অবাধ, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়েই। এমন প্রত্যাশার জায়গায় শেষ হওয়া ইউপি নির্বাচনের যে সন্তোষজনক অভিজ্ঞতা সেটাই সামনের দিনে প্রবাহিত থাকুক এই আমাদের কামনা।
তিন উপজেলার ২১ ইউনিয়নে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য ও সাধারণ আসনের সদস্যবৃন্দকে আমাদের প্রাণঢালা অভিনন্দন। জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে আপনাদের নির্বাচিত করেছেন কার্যক্ষেত্রে আপনারা তার রূপায়ণ ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে গণমুখী রাখতে অনবদ্য ভূমিকা রাখুন এই আমাদের কামনা।