২১ মার্চ ১৯৭১, ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাব দিবস পালনের সিদ্ধান্ত

পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি এবং বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অসহযোগের সমর্থনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গণসংগঠনের সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগানে রাজধানীসহ সারাদেশের রাজপথ আগের মতোই প্রকম্পিত থাকে। সকালে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে মিলিত হন। মি. ফারল্যান্ড বঙ্গবন্ধুকে এমন কিছু প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যাতে বঙ্গবন্ধু তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তৎক্ষণাৎ সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আজ এক অনির্ধারিত বৈঠকে মিলিত হন। প্রায় ৭০ মিনিট স্থায়ী আজকের বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একমাত্র সহকর্মী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। অন্যপক্ষে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে ছিলেন তার আইন উপদেষ্টা বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস এবং সামরিক উপদেষ্টারা। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
বাসভবনে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ইয়াহিয়া ও তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে চারটি শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওনারা আমার কাছে একটা কথাই বারবার বলছেন যে, আগে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসুক। আমি স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছি, এত কিছু হওয়ার পরে আমার কাছে ওই চার দফা ছাড়া আর অন্য কোনো কথা নেই। আমি আমার জনগণের কাছে যা বলেছি, বারবার তাই আমি আপনাদের কাছেও বলছি। এ ভিন্ন আমার অন্য কোনো কথা নেই। আলোচনা সফল করতে হলে এখন প্রেসিডেন্টকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আজও বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ছিল সারাদেশ থেকে আসা হাজার হাজার নারী-পুরুষ-যুবক-শিশুর পদভারে মুখরিত। তাদের প্রত্যেকেই পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলে উচ্চকণ্ঠে স্লোগান দিচ্ছিল। আগত মিছিলকারীদের উদ্দেশে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের দাবি পরিপূরণ না হওয়া পর্যন্ত সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে কোনো প্রকার শৈথিল্য দেখানো যাবে না। আন্দোলন অতি অবশ্যই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে। বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশের জনগণ আজ যে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তা কোনোভাবেই মলিন করা চলবে না।
স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার স্লোগানমুখর মিছিলের উদ্দেশে দৃপ্তকণ্ঠে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি উপনিবেশ এবং বাজার বানিয়ে রাখার দিন শেষ হয়ে গেছে। এ জাগ্রত জাতিকে কেউ আর দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা আমাদের দাবির বৈধতা প্রতিপন্ন করেই এগিয়ে যাব। এ সময় সংগ্রামী জনতা নেতার নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সংহতি ঘোষণা করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ঘোষণা করে।
এদিন পিপলস পার্টির প্রধান মি. ভুট্টো করাচি থেকে ঢাকা আসেন। ঢাকায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই সংগ্রামী জনতা তার বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কড়া সামরিক নিরাপত্তায় তিনি হোটেলে পৌঁছান। মি. ভুট্টোর সঙ্গে ছিল ১৩ জন উপদেষ্টা এবং প্রায় এক ডজন সশস্ত্র দেহরক্ষী।
রাতে ভুট্টো ও ইয়াহিয়া দু’ঘণ্টা স্থায়ী এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন এবং ২৫ মার্চের গণহত্যার নীলনকশা চূড়ান্ত করেন। রাতে বিদেশি সাংবাদিকদের মি. ভুট্টো বলেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বঙ্গবন্ধু আগামী ২৩ মার্চ সারা বাংলাদেশে পাকিস্তান দিবসের বিপরীতে লাহোর প্রস্তাব দিবস পালন এবং সেদিন যেন বাংলাদেশের প্রতি ঘরে ঘরে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের পতাকা ওড়ে আর সারাদেশে সাধারণ ছুটি পালিত হয়, সে প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন আগামী ২৩ মার্চ প্রতিরোধ দিবসের কর্মসূচির প্রতি তাদের সমর্থন ঘোষণা করে। মগবাজারে মহিলা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক মহিলা সমাবেশে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে একটি প্যারা- মিলিটারি গঠনের আহ্বান জানানো হয়।
এদিন নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় পরিপূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে এক অভিনব নৌ ও জাহাজ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার নর-নারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে দশদিগন্ত মুখরিত করে এই বর্ণাঢ্য মিছিলে অংশগ্রহণ করে।
বিকেলে চট্টগ্রামে ন্যাপের প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পোলো গ্রাউন্ডে এক বিশাল জনসভায় বলেন, আলোচনায় ফল হবে না। এদেশের হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে চাপরাশি পর্যন্ত যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে মানে না, তখন শাসনক্ষমতা শেখ মুজিবের হাতে দেওয়া উচিত। ইসলামের ভাঁওতা দিয়ে আর আমাদের শাসন করো না। আমরা এ দেশকে স্বাধীন করবই।
এদিন সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষুব্ধ লেখক ও শিল্পীরা সাহিত্য ও গণসংগীতের আয়োজন করেন।