স্টাফ রিপোর্টার
১৯৭১-এর ২২ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ২১তম দিবস। সকাল সাড়ে ১১টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হন। প্রায় ৭৫ মিনিটব্যাপী আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার নির্ধারিত বৈঠক ছিল। সেখানে মি. ভুট্টো উপস্থিত ছিলেন। আমি প্রেসিডেন্টকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে, ৪টি শর্ত পরিপূরণ না হলে আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে পারি না।
এদিন লেখক সংগ্রাম শিবির বাংলা একাডেমীতে ড. আহমদ শরীফের সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদী কবিতা পাঠের আসর আয়োজন করে। এতে আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফজল শাহাবুদ্দিন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হুমায়ুন কবির, শাহনুর খান, আখতার হোসেন, রফিক নওশাদ, মাহবুব সাদিক, সালেহ আহম্মদ, দাউদ হায়দার, মাকিদ হায়দার, মেহেরুন্নেসা প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।
আজ পত্রিকায় প্রেরিত এক বিশেষ বাণীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমাদের আন্দোলনের বৈধতার কারণে বিজয় এখন থেকে আমাদেরই। বাংলাদেশের সব দৈনিক পত্রিকার জন্য প্রেরিত এ বাণীটির শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশের মুক্তি’। বাণীতে সাত কোটি বাঙালির সামগ্রিক মুক্তির জন্য চলমান আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু বলেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম চলবে। বুলেট, বেয়নেট এবং বন্দুক দ্বারা বাংলাদেশের মানুষকে স্তব্ধ করা যাবে না; কারণ তারা আজ ঐক্যবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য অর্জনে যে কোনো প্রকার আত্মত্যাগে আমরা প্রস্তুত। যে কোনো আক্রমণ প্রতিহত করতে বাংলাদেশের প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।
এদিকে সন্ধ্যায় সংবাদপত্রে প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জেনারেল ইয়াহিয়া বলেছেন, পাকিস্তানের উভয়াংশের নেতৃবৃন্দ এবং রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে সমঝোতার ক্ষেত্র অধিকতর প্রসারিত করার সুবিধার্থে ২৫ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলো।
২৫ তারিখের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সারাদেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। মিরপুরের সংগ্রামী জনতা বঙ্গবন্ধুর ৪ দফার সমর্থনে আজ বিকেল ৫টায় বিশাল এক ট্রাক মিছিল বের করে নগরীর বিভিন্ন দিক প্রদক্ষিণ শেষে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে এসে নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ ছাড়াও সাবেক চাকরিজীবী অ্যাসোসিয়েশন, চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট অ্যাকশন কমিটি, এসএসসি পরীক্ষার্থী সমিতি, বাস্তুহারা সমিতি, ঢাকা দোকান মালিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ, গভর্নমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশন ও ওয়াপদা ওয়ার্কার্স ফেডারেশন বায়তুল মোকাররম ও শহীদ মিনারে মিছিল সমাবেশ করে নিজ নিজ ব্যানারে স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান সহকারে শোভাযাত্রা বের করে।
বিকেলে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিমান, নৌ ও স্থলবাহিনীর প্রাক্তন সৈনিকদের এক সম্মিলিত সমাবেশে বাংলাদেশের সব অবসরপ্রাপ্ত সৈনিককে নিজ নিজ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সংগ্রাম পরিষদ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠিত করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। মেজর জেনারেল (অব.) এম আই মজিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশটি পরিচালনা করেন কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানী, এমএনএ। সমাবেশে দেশের আসন্ন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উপস্থিত সবাই শপথ গ্রহণ করেন। যারা এ সমাবেশে আসতে পারেননি, তাদের প্রতিও আসন্ন যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে শামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সৈনিক এবং অফিসারদের প্রতিও কর্মস্থল ত্যাগ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সমাবেশ থেকে উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। সাবেক সামরিক অফিসার ও সৈনিকরা সমাবেশ শেষে এক মিছিল সহকারে প্রথমে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যান। সেখানে কর্নেল ওসমানী এক সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে উপস্থিত সবাইকে রক্তশপথ অঙ্গীকারনামা পাঠ করান। এরপর মিছিল সহযোগে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আসেন। বঙ্গবন্ধু বাড়ির সদর দরজায় এসে জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে তাদের স্বাগত জানান। অতঃপর মেজর জেনারেল (অব.) এম আই মজিদ, কর্নেল (অব.) ওসমানীসহ মোট চারজন বঙ্গবন্ধুর লাইব্রেরি কক্ষে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকে কর্নেল ওসমানী বঙ্গবন্ধুর হাতে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে একটি তরবারি তুলে দেন।
ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে সন্ধ্যা ৬টায় বঙ্গবন্ধু তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী এবং দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সর্বজনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে এক আলোচনা বৈঠকে বসেন। মূলত এই বৈঠকেই সাব্যস্ত হয় যে, যখনই পাকিস্তান সামরিক বাহিনী গণহত্যা শুরু করবে, ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণাটি ওয়্যারলেস সেটের মাধ্যমে ঢাকা বা চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হবে। বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয় যে, স্বাধীনতার ঘোষণা বাণীবদ্ধ করে বঙ্গবন্ধু নিজ বাড়িতেই অবস্থান করবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে তিনি কখনোই পলায়ন করতে পারেন না।
- স্বাস্থ্যবিধি না মানলে মোবাইল কোর্টে জরিমানা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
- আজ স্পট মার্কেটে যাচ্ছে লাফার্জহোলসিম


