বিন্দু তালুকদার
‘গতবারও বাঁধ ভাইঙা (ভেঙে) ফসল ডুবছে, ইবারও ফসল ডুবলে, ই-এলাকা ছাইড়া অন্য কোন যেগাত (অন্য স্থানে) যাওন লাগবো।’ দিরাই উপজেলার বরাম হাওর পাড়ের ধল গ্রামের বাসিন্দা সুকুমার দাস শুক্রবার তুফানখালি বাঁধের ভাঙন অংশে বস্তা দিয়ে মাটি ফেলতে ফেলতে এসব কথা বলছিলেন। গত ৩ দিনের ভারী বর্ষণে সুনামগঞ্জের সকল নদীর পানি বেড়েছে।
দিরাই উপজেলার কালনী নদীর পানি বাড়ায় বরামহাওর পাড়ের কাদিরপুর ও ধলের মাঝামাঝি তুফানখালি বাঁধের একটি অংশ শুক্রবার ভোরে ভেঙে গেলে পুরো এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ভোর থেকে শত শত কৃষক নিজ উদ্যোগে বাঁধ ঠেকানোর কাজে লাগেন। স্থানীয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা, সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলামসহ পাউবো কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
ধলের কৃষক আব্দুল তোহায়েদ বলেন, ‘কেবল তুফানখালি বাঁধ নয়, দিরাই উপজেলার অনেক বাঁধই হুমকির মুখে পড়েছে। অসময়ে কাজ করায়, কোন কোন বাঁধে কাজ না হওয়ায় সবকয়টি হাওর রক্ষা বাঁধেরই একই অবস্থা।’
শুক্রবার বিকালে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের পাশে সুরমা নদীর পানি ৬.৪০ মিটারে প্রবাহিত হয়েছে ও সকাল ৬ টা পর্যন্ত ৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নদীর পানি বেড়ে বাঁধ উপচে ও বাঁধ ভেঙে জেলার ধর্মপাশা উপজেলার ৮ টি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। প্রায় ২ হাজার হেক্টর বোরো জমি পানিতে ডুবেছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. জাহেদুল হক জানিয়েছেন, বাঁধ ভেঙে প্রায় এক হাজার হেক্টর, জলাবদ্ধতায় ডুবেছে আরো প্রায় ১ হাজার হেক্টর। ধর্মপাশা উপজেলার ধারাম, দিরাইয়ের বরাম, তাহিরপুরের শনি ও মাটিয়ান হাওরে বাঁধ অত্যন্ত
ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অনেক বাঁধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাউকে পাচ্ছেন না কৃষকরা।
শুক্রবার সকালে ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনারথাল, ডুবাইল, মধ্যনগর থানার মধ্যনগর মেঘনা, মরিচাউরি, শালদিঘা, চামরদানী ইউনিয়নের গুরমা, কাইলানী, আরিবন, বুড়া ছুপরি হাওরের বাঁধ ভেঙে পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য জেলার বিভিন্ন হাওরপাড়ে মাইকিং করে কৃষকদের বাঁধে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
পানিতে ডুুবে ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের রাজাপুর, ঘোল্লা, মাহমুদপুর, মুক্তারপুর, দয়ালপুর ও আমানীপুরসহ আশপাশের সকল গ্রাম, মধ্যনগরের সদর ইউনিয়নের পাইকপাড়া, বৈঠাখালী, জমসেরপুর, নোয়াগাঁও, পিপড়াকান্দা, বৌলাইখালী, তেলিপাড়া গ্রাম, চামরদানী ইউনিয়নের আবিদনগর, কাদিপুর, সাদিপুর, দুগনই, কাহালা, বিশাড়া, সাজদাপুর, কামারগাঁও, নন্দীপাড়া, দরাপপুর নোয়াগাঁও ও জগন্নাথপুর, বংশিকুন্ডা ইউনিয়নের পলমাটি গ্রাম, জয়শ্রী ইউনিয়নের স্বরস্বতীপুর, তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের কৃষকদের বোরো ফসল তলিয়েছে।
হুমকির সম্মুখিন বাঁধগুলোতে স্থানীয় লোকজন বাঁশ ও বস্তা নিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।
দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুছ সকালে বাঁধ পরিদর্শনে গেলে তাকে ধাওয়া করে উত্তেজিত কৃষকরা। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে রক্ষা করে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা অভিযোগ করছেন, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ সময়মত না করায় চৈত্রমাসেই বোরো ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের ছয় মাসের কষ্ট কয়েক ঘণ্টায় পানিতে তলিয়ে গেছে।
নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ও দুর্বল বাঁধের কারণে হুমকিতে রয়েছে জেলার দিরাই উপজেলার বরাম হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনা ও হালির হাওর, তাহিরপুর উপজেলার শনি ও মাটিয়ান হাওর, সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচা, জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দেখার হাওরসহ ছোট বড় অনেক হাওরেরই বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।
ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান আমানুর রাজা চৌধুরী বলেন,‘ পাউবোর ঠিকাদার বাঁধ নির্মাণ না করায় ডুবাইল হাওর বৃহস্পতিবার রাতে তলিয়ে গেছে। সকল ফসল কাঁচা অবস্থায় ডুবেছে।’
মধ্যনগর থানার চামরদানী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান প্রভাকর তালুকদার পান্না বলেন,‘বাঁধ নির্মাণে পাউবো ও পিআইসির অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই অল্প বৃষ্টিতেই দুর্বল বাঁধ সহজে ভেঙে যাচ্ছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন,‘দুর্বল বাঁেধর কারণে বৃষ্টির পানিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুইটি বাঁধ ভেঙে ধর্মপাশার চন্দ্র সোনারথাল, ডুবাইল হাওর ও পিআইসির বাঁধ ভেঙে মধ্যনগরের গুরমা, কাইলানী, মেঘনা, মরিচাউরি হাওরের বাঁধ ভেঙে পানিতে তলিয়ে গেছে। বাঁধ ভেঙে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে। বৃষ্টি বন্ধ না হলে জলাবদ্ধতার পরিমাণ বাড়তে থাকবে। ’
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আফছর উদ্দিন বলেন,‘ ধর্মপাশার চন্দ্রসোনার থাল, ঘুরমা ও দোয়ারাবাজারের দোহালিয়া, দিরাইয়ের বরাম হাওরের গাগড়াখালী ও তুফানখালী বাঁধ ঝুঁিকতে রয়েছে। এসব বাঁধগু রক্ষার প্রাণপন চেষ্টা করা হচ্ছে। মধ্যনগরে যে কয়েকটি বাঁধ ভেঙে হাওর ডুবেছে সেই বাঁধগুলি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে নয়।’
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘ টানা বৃষ্টিপাতে সকল নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকছে। দিরাইয়ের তুফানখালী বাঁধটি রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। সময়মত বাঁধ নির্মাণ না করা ও বাঁধ নির্মাণে পিআইসিদের চাহিদামত বরাদ্দ না দেবার অভিযোগ রয়েছে। জেলার সকল হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় দিনরাত চেষ্টা করছি আমরাও। সকল ইউএনওকে বাঁধে কঠোর নজরদারী করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাঁধে থাকতে অনুরোধ করেছি।’
উল্লেখ্য, চলতি বছর সুনামগঞ্জে বোরো ফসলের আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে। ৪২টি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫৮ কোটি টাকা ৭০ লাখ টাকা। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের বৃহৎ ৩৭টি হাওরসহ মোট ৪২ টি হাওরে ১০ কোটি ৭৭ লাখ ব্যয়ে ২২৫ টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) ও ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৬ টি প্যাকেজে ঠিকাদার দিয়ে বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করছে। পিআইসির কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ঠিকাদারের কাজ ৩১ মার্চের মধ্যে শেষ হবার কথা থাকলেও অনেক পিআইসির কাজ শেষ হয়নি ও অনেক ঠিকাদার সবেমাত্র কাজ শুরু করেছে।’
- ডুবছে হাওর, কাঁদছে কৃষক- সর্বস্ব হারিয়ে মাথায় হাত কৃষকদের
- ১ গিগাবাইট ইন্টারনেট ডাটা ক্রয়মূল্য ২৬ পয়সা, গড় বিক্রয় ২১৭ টাকা


