বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
শান্তি ও সম্প্রীতির জনপদ হিসেবে পরিচিত জামালগঞ্জ হঠাৎ অশান্ত হয়ে পড়েছে। এ উপজেলায় সাম্প্রতিক হত্যা, খুন, ধর্ষণ, হানাহানিসহ নানা অপকর্মে নিকট অতীতের সকল নেতিবাচক কর্মকাণ্ডকে চাপিয়ে গেছে। তুচ্ছ ঘটনার জেরে গত মাসতিনেকের মধ্যে ৪ জন খুন হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ধর্ষকের লালসার শিকার হয়েছে ২ কিশোরী। এর মাঝে রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে এক নবজাতকের মরদেহ। সম্প্রতি বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদারের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া ছোটখাট বিষয় নিয়ে প্রায় সময়ই পক্ষ-বিপক্ষের মাঝে দাঙ্গা-হাঙ্গামার কথাও শোনা যাচ্ছে। সবকিছু মিলে শান্তির জনপদে অশান্তির বাতাস বইছে।
জানা যায়, গত ৯ মে বেহেলী ইউনিয়নের বেহেলী আলীপুর গ্রামে জায়গা সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের জের ধরে চাচাতো ভাই কর্তৃক ভাই-ভাবী খুন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে মো. তাহির আলীর ছেলে মো. আলমগীর (৩৬) ও তার স্ত্রী মোছা. মুর্শেদা বেগম (৩২) খুন হয়েছেন। তাহের আলীর আপন ভাই জনর আলীর ছেলে মো. রাসেল মিয়া নিহতের ঘরে ঢুকে এ নৃশংস ঘটনাটি ঘটিয়েছে। এ ঘটনায় খুনীসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে প্রধান অভিযুক্ত রাসেল এখনও পলাতক রয়েছে বলে জানা গেছে।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই ১২ মে সাচনা বাজার ইউনিয়নের শরিফপুর গ্রামের রাস্তার পাশ থেকে সিকান্দর আলী (৪২) নামের এক অটোরিক্সা চালকের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত সিকান্দর উক্ত ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামের আব্দুর রউফের ছেলে। এ হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে জীঘাংসাবশতঃ স্বার্থাস্বেষী কেউ এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। এই ব্যাপারে জামালগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। এ ঘটনায় মানববন্ধন করেছে এলাকার কয়েকটি সংগঠন। তাতে প্রকৃত খুনীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় চাপা ক্ষোভ ও প্রতিবাদ অব্যাহত আছে।
অপরদিকে, গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে একই ইউনিয়নের কুকড়াপশী নিজ বাড়িতে বর্বরোচিত হামলার শিকার হন মো. আবুল কাসেমসহ তার পরিবারের লোকজন। পরে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পার্শ্ববর্তী পলক গ্রামের একটি সংঘবদ্ধ চক্র এ হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া গত ২৬ এপ্রিল রাতে জামালগঞ্জে দুই কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পরের দিন ধর্ষিতা এক কিশোরীর পিতা চাঁনপুর আবুরহাঁটি গ্রামের ধর্ষক আলমগীর মিয়া (২৫) ও আবুল কালাম (২৬) কে অভিযুক্ত করে জামালগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। পরে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে জামালগঞ্জ থানা পুলিশ। এছাড়া গত ৮ মে এক নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বেহেলী ইউনিয়নের রাজাপুর-বাগহাঁটির ব্লকের রাস্তার পাশ থেকে নবজাতকের মৃতদেহটি উদ্ধার করে জামালগঞ্জ থানা পুলিশ। কে বা কারা এই নবজাতককে সেখানে ফেলে গেছে সে ব্যাপারে কিছু জানা যায়নি।
অন্যদিকে, গত ২৭ এপ্রিল রাতে বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদারসহ তার মোটরসাইকেল চালক এরশাদ মিয়ার ওপর অতর্কিত হামলা চালায় হরিনগর গ্রামের কথিত লোকজন। এতে চেয়ারম্যান ও চালক দু’জনেই গুরুতর আহত হন। পরে অসীম তালুকদার বাদী হয়ে ২১ জন নামাঙ্কিত অজ্ঞাত আরও ২০-২২ জনকে বিবাদী করে জামালগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত বলে জানা গেছে।
এসব ঘটনায় এলাকার সচেতন লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, মানুষের মধ্যে আগের সম্প্রীতি কমে গেছে। এসব অপকর্মে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি দিতে না পারলে দিন দিন এই অপতৎপরতা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন এলাকার সচেতন মানুষেরা।
কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি পরিষদের সহ সভাপতি মো. আলী আমজাদ বলেন, দিনদিন মানুষ তার মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলছে। তার অন্যতম কারণ পারিবারিক ও মানবিক শিক্ষার অভাব। এছাড়া একজন মানুষ অপরাধ করলে তার বিচার সঠিকভাবে হচ্ছে না। যে কারণে মানুষ অপরাধ করতে উৎসাহিত হচ্ছে। সবকিছু মিলে মানুষ বীভৎস রূপ ধারণ করছে।
সাচনা বাজার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হক আফিন্দী বলেন, এক্ষেত্রে মানুষের নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতাসহ বিচারহীনতা অনেকাংশে দায়ী। এ থেকে উত্তোরণ ঘটাতে হলে মানুষকে তার পশুত্ব ত্যাগ করে মানবিকতার পথে ফিরে আসতে হবে।
জামালগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক অখিল তালুকদার জানিয়েছেন, গত প্রায় এক মাসে এ উপজেলায় কয়েকজন খুন এবং দুই কিশোরী ধর্ষণসহ বিভিন্ন জায়গায় পরস্পরের সাথে হানাহানি-মারামারি ঘটনাও ঘটছে। এ জন্য প্রকৃত দোষীদের বিচারের মুখোমুখী করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
জামালগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল আলম বলেন, এ উপজেলায় সম্প্রতি যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে এর জন্য ব্যক্তি অসচেতনতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দায়ী। কারণ বেহেলী-আলীপুর ও শরীফপুর গ্রামে খুনের ঘটনাসহ ধর্ষণের যে ঘটনা ঘটেছে এগুলো কী পুলিশ আগে থেকে জানত। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নয়, বরং মানুষের নীতিভ্রষ্টতাই দায়ী। তবে এসব ঘটনায় জড়িত প্রকৃত আসামীদের গ্রেপ্তারের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। পুলিশ অপরাধী কাউকেই ছাড় দেয় নি, দেবেও না।


