৬ হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপাদন সম্ভব

বিশেষ প্রতিনিধি
দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদনে দেশের শীর্ষতম জেলা সুনামগঞ্জ। গেল বছর এই জেলায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি মাছের উৎপাদন হয়েছে। ৬২ হাজার হেক্টর প্লাবন ভূমি ও ২০ হাজার ৫০০ পুকুর রয়েছে এই জেলায়। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে জেলায় মাছের উৎপাদন দ্বিগুন অর্থাৎ ৬ হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। হাওরের পানিকে অভিসাপ নয়, আশীর্বাদ হিসাবেও ব্যবহারের চিন্তা করতে হবে।
সুনামগঞ্জের হাওরে ১৪৩ প্রজাতির মাছ এখনো পাওয়া যায়। কয়েক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত বা বিপদাপন্ন হলেও বেশির ভাগ প্রজাতির মাছ এখনো চষে বেড়ায় হাওরে হাওরে। জেলায় ৬২ হাজার হেক্টরের মতো প্লাবনভূমিতে সারা বছরই বলতে গেলে পানি থাকে। আর বর্ষার তিন মাস উঁচু সড়ক ও বাড়ি-ঘর ছাড়া পুরো জেলাই ভেসে থাকে পানিতে। মাছ উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলেছেন, পানিকেই আয়ের উৎস বিবেচনা করে এগুলে, মাছের উৎপাদন এই জেলায় দ্বিগুন করা যেতে পারে।
চিতল, পাবদা, রুই ও আইড় মাছের মতো দামি মাছ এই জেলা থেকেই দেশে বিদেশে সরবরাহ হয়। গত বছর জেলায় ৯৮ হাজার ২২৯ টন মাছের উৎপাদন হয়েছে।
দিরাই
উপজেলার হাওরপাড়ের চিতলিয়া গ্রামের জয় কুমার দাস বললেন, কার্তিক মাস থেকে ফাল্গুন মাস মাছের অভয়াশ্রম নিরাপদ রাখতে হবে। বিল শুকিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে। মশারি জাল, কিরণমালা ছাইয়ে ক্যামিকেল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে। তাহলেই মাছে ভরে যাবে হাওর।
জলমহাল ব্যবসায়ী দিরাইয়ের উজানধলের শিক্ষিত তরুণ দোলন চৌধুরী জানালেন, ভাদ্র মাসের ১৫ তারিখের ( জুলাইয়ের শেষ দিক) পর থেকে মাছ বাড়ে বা বড় হয় কম, অথচ এবারও এই সময়ের পরে গত এক সপ্তাহ ধরে উপজেলায় উপজেলায় সরকারিভাবে পোনা ছাড়া হচ্ছে। পোনা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক শ্রেণির মানুষ কোনা জাল দিয়ে পোনা ধরছে। বিক্রি করছে কেজি দরে। তাতে কেবল টাকার অপচয় হচ্ছে, মাছের উৎপাদন বাড়াতে কাজ হচ্ছে একেবারেই কম।
বিশ^ম্ভরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপন কুমার বর্মণ বললেন, মাছের অভয়াশ্রম, চলাচল বা মাইগ্রেডেট রোডে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে মাছ পোনা ছাড়ে কম। হাওরে কোন কোন ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে, অপরিকল্পিত বাঁধ, ডোবা-খাল ভরাট হওয়া, পানির নিচের গাছ-গাছালি বা জলজ উদ্বিদ এবং হিজল-করচ বাগ নষ্ট হওয়ায় মাছের উৎপাদন কমছে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক জিএস, বর্তমানে জলমহাল ইজারা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মোজাম্মেল হক মুনিম জানালেন, দফায় দফায় বন্যায় ও পাহাড়ী ঢলে বেশিরভাগ জলমহালের তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে গভীর পানির মাছের বিচরণক্ষেত্র কমে গেছে। যেমন চিতল মাছের বিচরণ করার মতো জলমহাল এখন জেলায় হাতে গোনা দুয়েকটি। জলমহালের তলদেশ খনন করা জরুরি। এছাড়া মাছের উৎপাদন বাড়াতে ইজারাদারদের ভূমিকা রাখতে হবে। ইজারা শর্ত মেনে মাছ আরহরণ করতে হবে। যেমন ইজারা শর্তে রয়েছে ২ বছর মাছ সংরক্ষণ করে ৩ বছরে আহরণ করা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইজারাদাররা এই শর্ত না মেনে প্রতিবছর মাছ আহরণ করেন। এছাড়া মৎস্য অফিসের লোকবল আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তারা নিজেরা যাতে অভিযান পরিচালনা করতে পারে এমন লোকবল কাঠামোসহ আনুসাঙ্গিক সবকিছুই প্রয়োজন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদও এই সময়ে পোনা ছাড়তে দ্বিমত পোষন করে জানালেন, মে থেকে জুন মাসের মধ্যে হাওরে পোনা ছাড়লে ভালো হতো। এজন্য মার্চ-এপ্রিলে বরাদ্দ পাওয়া জরুরি।
এই মৎস কর্মকর্তা মনে করেন, সুনামগঞ্জে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর সকল উৎস রয়েছে। তবে এজন্য উদ্যোগ প্রয়োজন। যেমন মাছের সংরক্ষণ বা রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কারেন্ট জাল ও ছাই দিয়ে মাছ বন্ধ করতে ঘন ঘন মোবাইল কোর্ট করতে হবে। এজন্য ম্যাজিস্ট্রেট নির্ধারণ করা থাকতে হবে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বিল শুকিয়ে মাছ ধরা বা গণহারে মাছ আহরণ বন্ধ করতে হবে। বর্ষায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের অনেক গ্রামেই দেখা যায় তিন দিকেই গ্রামে বা সড়ক আছে, একদিকে হাওরের জলরাশি, এই পানিতে একদিকে নেট দিয়ে ঘেরাও করে পোনা ছাড়লেই ওখানে মাছ চাষ হয়। এই পদ্ধতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি নিবির পদ্ধতিতে মাছ চাষ করার জন্য কৃষিতে যেভাবে যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে, মাছ চাষেও যান্ত্রিকীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের ৬২ হাজার হেক্টর প্লাবন ভূমি ও ২০ হাজার ৫০০ পুকুরে ২০১৯ সালে ৯৮ হাজার ২২৯.০৭ টন মাছের উৎপাদন হয়েছে। গড়ে প্রতি কেজি মাছের মূল্য ৩০০ টাকা করে হিসাব করলে প্রায় ৩ কোটি টাকার মাছের উৎপাদন হয়েছে গেল বছর। উৎপাদন দ্বিগুন করা গেলে টাকার অংকে উৎপাদন হতে পারে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার।