পি সি দাস শাল্লা
হাওরের প্রত্যন্ত উপজেলা শাল্লায় এলজিইডি’র হিলিপ প্রকল্পের টাকা তুলে কাজ না করে আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেছে। কয়েকটি প্রকল্পে এমন অবস্থা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। টাকা আত্মসাতের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা একে অপরকে দোষারোপ করছেন। ২০১৪—১৫ অর্থবছরে উপজেলার আনন্দপুর বাজারে দেয়াল নির্মাণের বরাদ্দের টাকায় কাজ না করার লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে গত মঙ্গলবার। লিখিত অভিযোগ হওয়ায় প্রায় সাত বছর আগে লোপাট হওয়া সরকারি টাকার হদিস নিয়ে কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের আনন্দপুর বাজারে ২০১৪—২০১৫ অর্থ বছরে ১০০ মিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের জন্য আনন্দপুর হিলিপ সমিতির মাধ্যমে ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৩ শত ৩১ টাকা বরাদ্দ হয়। সমিতির সভাপতি ধীরেন্দ্র বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক বিজয় মাইষ্যের স্বাক্ষরে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩শ’ ৪৯ টাকা কাজের নামে উত্তোলন হয়। কাজের মালামালও কেনা হয়। কিন্ত কাজে হাতই দেওয়া হয় নি। বালু—পাথর রড বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রকল্পের কাজ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হন এলাকাবাসী। গত মঙ্গলবার আনন্দপুর গ্রামবাসী ও বাজারের ব্যবসায়ীরা হিলিফ কর্তর্ৃপক্ষের নিকট এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
আনন্দপুর বাজার কমিটির সভাপতি শশধর দাস বললেন, বাজারের উন্নয়নের টাকা এভাবে গিলে খাওয়ায় ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে আইনী ব্যবস্থা নেবার দাবি জানিয়েছেন সকলে।
খেঁাজ নিয়ে জানা গেছে, হিলিপ প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা—কর্মচারীরা এসব অনিয়ম দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় এসব প্রকল্পের খেঁাজই কেউ রাখবে না চিন্তা করে তাদের যোগসাজসেই এই টাকা লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আনন্দপুর বাজারের দেয়াল নির্মাণ প্রকল্পের টাকা হিলিপ সমিতির সভাপতি ও সম্পাদকের নামে উত্তোলন হলেও সবকিছু তখনকার ইউপি সদস্য মিহির রায় করেছেন বলে দাবি করেন হিলিপ সমিতির সভাপতি ধীরেন্দ্র বিশ্বাস।
বাজারের ব্যবসায়ী কৃপেশ দাস বললেন, বাজারের পুর্ব দিকে দেয়ালের কাজের বালু, পাথর, রড আনা হয়েছিল। পরে মিহির রায় মালামাল বিক্রি করে দিয়েছেন।
বাজার কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বললেন, আমি কমিটিতে থাকা অবস্থায় হিলিপ প্রকল্পের মাধ্যমে বাজারের প্রতিরক্ষা দেয়ালের জন্য টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজের মালামাল আনা হয়। পরে সেই মালামাল মিহির রায় বিক্রি করে দেন। এ নিয়ে আমি কথা বলেছিলাম, বাজার কমিটির সভাপতি মিহির রায়ের পিতা রবীন্দ্র রায় বিষয়টি দেখবেন জানানোয় পরে এ নিয়ে আর কথা বলা হয় নি। তিনি বললেন, প্রকল্পের দায়িত্বশীলরা এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত, না হয় তারা এই ব্যাপারে প্রায় ৭ বছর কোন ব্যবস্থা নিলেন না কেন।
বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী সাবেক মেম্বার কালাই মিয়া তালুকদার বললেন, দেয়ালের মালামাল ওই সময় আনা হয়েছিল। মিহির রায় কেন মালামাল নিয়ে গেলেন জানি না। উপজেলা এলজিইডি অফিসে কয়েকবার গিয়ে বিষয়টি জানানোর পরও তারা আমলে নেন নি। আমাদের মনে হয়েছে এই টাকার ভাগ প্রকল্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা পেয়েছিলেন, না হয় তারা ব্যবস্থা নিতেন।
বাজারের একজন ব্যবসায়ী বললেন, দেয়ালের টাকা ইউপি সদস্য মিহির রায় আত্মসাত করার সময় সভাপতি ছিলেন তার বাবা রবীন্দ্র রায়। পরের বারে সভাপতি ছিলেন মিহির রায়ের ভাই রঞ্জিত রায়। এজন্য এই সময়কালে এ নিয়ে কেউ লিখিত প্রতিবাদ জানায় নি।
হিলিপ প্রকল্পের সভাপতি ধীরেন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমি সভাপতি হলেও টাকা উত্তোলন করে মালামাল ক্রয় ও বিক্রয় করেন মিহির রায়। আমি সহজ সরল মানুষ, এখন শুনতেছি টাকা আমাকে পরিশোধ করতে হবে। টাকা ফেরৎ দিলে তো মিহির রায় দেবেন।
হিলিপ প্রকল্পের শাল্লা অফিসের কর্ম সহকারী মোরশেদ আলম বলেন, আনন্দপুর বাজার প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ কাজের জন্য প্রথম বিলের ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩শ ৪৯ টাকার মালামাল ক্রয় করা হয়েছিল। পরে সেই মালামাল সাবেক মেম্বার মিহির রায় বিক্রি করে দেন। এ কারণে কাজটি হয় নি। টাকা ফেরৎ দেবার জন্য বার বার মিহির রায় কে বলা হচ্ছে, কিন্তু তিনি ফেরৎ দিচ্ছেন না। এলাকাবাসী মঙ্গলবার এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযুক্ত মিহির রায় এ প্রসঙ্গে দোষলেন হিলিপ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের। তিনি বললেন, হিলিপ প্রকল্পের দায়িত্বশীলরাই টাকা উত্তোলন করে বালু পাথর কিনে রাখেন। বাজারের কাছে রাখা এই বালু—পাথর দীর্ঘদিনে মেঘে— পানিতে ধুয়ে মুছে নিয়ে গেছে। আমি টাকার বিষয়ে কিছুই জানি না। হিলিপের লোকজনই এই বিষয়ে জবাব দিতে পারবেন। গ্রাম্য বিরোধের জের ধরে আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক দায়িত্বশীর ব্যক্তি জানান, হিলিপ প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা কেবল আনন্দপুরে নয়, উপজেলার নোয়াগাঁও, পুটকা, গোবিন্দপুর, কার্তিকপুরসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে।
হিলিপ প্রকল্পের উপ—সহকারী প্রকৌশলী হাসিরুল ইসলাম বললেন, প্রকল্পের দায়িত্বশীল কোন কর্মকর্তা টাকা উঠায়নি। টাকা কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকের হিসাবে ছিল। তারাই অর্ধেক টাকা উঠিয়ে মালামাল কিনেছিলেন। বাকী টাকা এখনো তাদের হিসাবে আছে। কাজের মালামাল মিহির রায় বিক্রি করেছেন বলে ইতিপূর্বে স্বীকারও করেছেন। তিনি বলেছেন, মালামাল আমার দায়িত্বে নিয়েছি, আমি ফেরৎ দেব। সরকারি এই টাকার এখন কি হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিহির রায় আগের টাকা ফেরৎ দেবেন, ওই টাকা এবং সভাপতি ও সম্পাদকের হিসাবে থাকা টাকা এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী ও হিলিপ প্রকল্পের জেলা সমন্বয়কারীর যৌথ হিসাবে ফেরৎ দেওয়া হবে। নেয়াগাঁওয়ে ৫০০ মিটারের মধ্যে ৪৫০ মিটার গার্ডওয়াল, পুটকা ও গোবিন্দপুরেও ৮০ ভাগের চেয়ে সামান্য কম কাজ হয়েছে বলে দাবি করেন এই প্রকৌশলী।
- শহরের মাংসের দোকানে অনিয়ম, খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসাকে স্বচ্ছ ও ন্যায্য করুন
- ‘ফসল বাঁচাতে সকল প্রস্তুতি নিতে হবে’


