বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জঙ ধরেছে শত বছরের ঐতিহ্যে। মরচেপড়া বিবর্ণতায় রঙ হারিয়েছে চালের টিনগুলো। ঘরের বেষ্টনীতে জীর্ণতার চাপ। ভেতরে বাসা বেঁধেছে পতঙ্গ চামচিকেরা। প্রাচীনতার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নির্জীব স্থাপনার কাছ ঘেঁষলে অনুভব করা যায় রক্ষার নীরব আকুতি। সেবা আর ঐতিহ্যে গর্বিত স্থাপনাটি একদা বহু মানুষের রোগমুক্তিতে ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে নিজেই রোগাক্রান্ত হয়ে বেঁচে থাকার যেন আকুতি জানাচ্ছে। বারবার নিজেকে রক্ষার নিশ্চুপ দাবি জানিয়ে ব্যর্থপ্রায় জামালগঞ্জের সাচনা বাজারের শহীদ মিনার সংলগ্ন পুরোনো হাসপাতালটি এখন বাজারের ডাস্টবিন হয়েছে।
একসময়কার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা উপজেলার একমাত্র এই চিকিৎসা কেন্দ্রটি বর্তমানে দূষণ ও দখলের শিকার হয়ে এলাকাবাসীর বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপন্ন শতবর্ষী এ হাসপাতালে দেশবরেণ্য রাজনীতিক প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্ম হয়েছে এমন জনশ্রুতিও রয়েছে। খর¯্রােতা নদী সুরমায় পৃথক হওয়া উপজেলার প্রায় অর্ধেকে বিস্তৃত সাচনাবাজার অংশের জরুরী স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে পুরোনো জরাজীর্ণ এ হাসপাতালটিকে সংস্কার করে অন্ততঃ ১০ শয্যাবিশিষ্ট দাতব্য চিকিৎসালয় করার জোর দাবি জানিয়ে আসছেন এলাকাবাসী। মানুষের এমন দাবি আমলে নিচ্ছেন না কেউই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার কামলাবাজ মৌজার জেএল নং-১৮, ৭৪৮৬ নম্বর দাগে ৪৬ শতক ভূমির উপর স্থাপিত পুরাতন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি বারবার অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়েছে। অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় সেটি অবৈধ দখলমুক্ত করে সীমানা প্রাচীর দেওয়া হয়েছিল। তারপরও দখল ও দূষণমুক্ত হতে পারছে না হাসপাতালটি। বর্তমানে একটি চক্র হাসপাতালের ভূমি বন্দোবস্ত নিয়ে দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা জানান, সাচনা বাজারের পুরোনো এই হাসপাতালটি ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাওর-বাওরের উপজেলায় ঐ একটিমাত্র চিকিৎসালয়ই তখন ছিল। তৎকালীন সময়ে জেলা শহরের সাথে পায়ে হাটা ছাড়া অন্য কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় মানুষের রোগমুক্তির অন্যতম ভরসাস্থল ছিল সেটি। সেখানে একজন এলএমএফ ডাক্তার ও দুইজন কম্পাউন্ডারসহ চিকিৎসা সেবা পরিচালনা করতেন। স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে ডা. শামসুল ইসলাম চৌধুরী (পাগলা ডাক্তার হিসেবে খ্যাত), ডা. মতিলাল সিনহা, ডা. গ্রীষ্পতি নন্দন চৌধুরী, ডা. রইছ উদ্দিন, ডা. আহমদ হোসেন ও ডা. আকমল হোসেন এ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে কম্পাউন্ডার হিসেবে গোপেন্দ্র কুমার আচার্য্য, কার্তিক দাস ও ক্ষীরদ মোহন রায়ের নাম বলেছেন বয়স্করা।
হাসপাতালের কম্পাউন্ডার প্রয়াত গোপেন্দ্র কুমার আচার্য্যরে ছেলে সমরেন্দ্র আচার্য্য শম্ভুর সাথে কথা বলে জানা যায়, তার বাবা ১৯৪৯ সালে সাচনা বাজারের এই হাসপাতালটিতে যোগদান করেছেন। বাবার রেখে যাওয়া পুরাতন নথি ঘাটতে গিয়ে তিনি যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত হন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে সুরমার ওপর পারে জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার পর সেটি সেখানে স্থানান্তরিত হয় এবং এর কয়েক বছর পর তার বাবা অবসরে যান। গোপেন্দ্র আচার্য্য সেখানে কর্মরত থাকাবস্থায় সর্বশেষ ৪ জনের একটি স্টাফ ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। যার মধ্যে দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের সুরুজ মিয়া পিয়নের চাকরি করতেন।
সাচনা চৌধুরী বাড়ির অমল কান্তি ঘোষ চৌধুরী (৮৮) ও একই গ্রামের মন্তোষ সরকার (৭৬) বলেন, ‘এ হাসপাতালটি ছাড়া একসময় এখানে দ্বিতীয় কোনো চিকিৎসা কেন্দ্র ছিল না। অনেক ডাক্তার এখানে চাকরী করে গেছেন। কিন্তু বর্তমানে ভাঙাচুরা দুই-তিনটি ঘর ছাড়া সেখানে পাওয়ার কিছু নেই। রাতে যদি কোনো গর্ভবতীর প্রসবজনিত সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে নদী পার হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়া সম্ভব নয়। এখানকার সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবার কথা চিন্তা করে ভঙ্গুর এই হাসপাতালটিকে জরুরী ভিত্তিতে সংস্কার করে চালু করা দরকার।’
সাচনা গ্রামের ৮৪ বছর বয়সী মো. আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, ‘এ হাসপাতালে খুব ভালো ডাক্তার ছিলো এবং চিকিৎসার মানও ছিলো খুব ভালো। আমি নিজেও এখানে চিকিৎসা করিয়েছি। তখন শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর কোনো সুযোগ ছিল না। পায়ে হেঁটে সুনামগঞ্জ যেতে সময় লাগতো ৫ থেকে ৬ ঘন্টা। এলাকায় চিকিৎসার মূল কেন্দ্র হিসেবে হাসপাতালটির গুরুত্ব ছিল আলাদা। যখন জামালগঞ্জে হাসপাতাল হলো, তখন থেকে এ হাসপাতালটি অচল হয়ে পড়ে। সুরমা নদীর উত্তরপারের লাখো মানুষের জরুরী চিকিৎসা সেবার কথা চিন্তা করে হাসপাতালটি চালু করা প্রয়োজন।’
সাচনা বাজার ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম শামীম বলেন, ‘উপজেলার ৩ ইউনিয়নের প্রায় ৪৫ ভাগ মানুষ সুরমার এই পারের বাসিন্দা। কিন্তু সেখানে জরুরী কোনো চিকিৎসার সুযোগ নেই। এক সময় সাচনা বাজারের এই পুরাতন হাসপাতালটিই ছিল চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল। বর্তমানে প্রাচীন হাসপাতালটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। শুনেছি ঐতিহ্যবাহী পুরাতন এ হাসপাতালের সরকারি ভূমি খাস খতিয়ানে নিয়ে বন্দোবস্ত দেয়ার পাঁয়তারা চলছে। সেটা বন্ধ হওয়া উচিত এবং এখানকার মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে দ্রুত হাসপাতাল প্রতিস্থাপন করে সরকারের স্বাস্থ্য সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার দাবি জানাই।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মঈন উদ্দিন আলমগীর বলেন, ‘এমপি মহোদয় আমাদের মৌখিকভাবে বলেছেন এখানে ১০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল হবে। আমরাও চাই চিকিৎসা সুবিধার্থে এখানে একটি হাসপাতাল হোক। সে মোতাবেক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা পাঠাবো। তার আগে সীমিত আকারে এখানে বহির্বিভাগ চালুর পরিকল্পনা আছে।’
সিভিল সার্জন ডা. শামছুদ্দিন আহমদ জানালেন, পরিত্যক্ত এই হাসপাতালের জমিতে নতুন স্থাপনা নির্মাণ করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্র করার জন্য প্রায় একবছর আগে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এখনো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোন সিদ্ধান্ত দেন নি।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন অবশ্য বলেছেন, ‘এখানে ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু হাসপাতাল করার পরিকল্পনা প্রকল্পভুক্ত হয়েছে। প্রক্রিয়াগত কাজ শেষে এর অবকাঠামোগত কাজ শুরু হবে।’


