এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
ছয়দফা দাবী মানতে হবে মানতে হবে। ‘ দুনিয়ার মজদুর এক হও ।
আমার বাবা ছিলেন ন্যাপের প্রথম সারির নেতা , আমার ভাই মানে দাদা ছাত্র ইউনিয়নের তখনকার বড় নেতা। আশে পাশে এই বাম ঘরানার মানুষদের দেখেছি কারণ তখন সবার স্বপ্নÑ রাশিয়া বা চীনের মতো সবার সমান অধিকার সম্পন্ন রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে। আমেরিকা উপনিবেশিক শক্তি তার মত পথ সঠিক নয়। পাকিস্তান সেই দুষ্ট শক্তির মদদে চলছে। কাজেই এই শক্তি ভেঙ্গে দিতে হবে ।
অন্যদিকে আমার নানা মতছিন আলী আওয়ামী লীগার। উনার চাচা শ^শুর হোসেন বক্তের ভক্ত। প্রায় প্রতি বিকালে উনার বাসায় বসতো আওয়ামী লীগের মিটিং। আওয়ামী লীগ গঠনের পর থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। ওখানে থাকতেন. আব্দুল হাই নানা, আফাজ উদ্দীন সাব, তৈয়বআলী হাজী সাব, ওবায়দুর রেজা সাব. আব্দুল বারী সাব, মতিন সাব, কিষন লাল বাবু, শিরিশ বাবু লাল মামা আরও কত জনা। তাদেরও আলোচনার বিষয় স্বাধীকার প্রাদেশিক স্বাধীনতা আর শেখ মুজিব। আওয়ামী লীগ আর বাম ঘরানার এই সম্মিলন সুনামগঞ্জে না সারা দেশেই প্রবল ছিলো। উভয়ের শত্রু তখন মুসলিম লীগ। শত্রু ছিলো জামাতে ইসলামী। আর তাদের কর্মকান্ড বড়ই সীমিত ছিলো। মুসলিম লীগের সমর্থক মনে মনে অনেকে হয়তো ছিলেন কারণ সদ্য অতীতে এই সংগঠনের হাত ধরেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। কিন্তু যে স্বপ্নে পাকিস্তান করা সেই স্বপ্ন ধুলিস্মাৎ হতে সময় লাগেনি। তাই আজ স্বাধীকারের জন্যে নিজেদের শাণিত করছে সবাই। আর ছাত্ররা এর প্রথমভাগে। প্রায় প্রতি সন্ধায় বেরুচ্ছে মিছিল ‘শিক্ষা শান্তি প্রগতি’- স্লোগান দিয়ে ছাত্রলীগের মিছিল। পরক্ষণেই ছাত্র ইউনিয়ন মিছিল বের করে ‘ঐক্য শিক্ষা শান্তি প্রগতি স্লোগান দিয়ে। মিছিল শেষে দুই গ্রুপ আবার একত্রে চা নাস্তা খায়। অপরূপ মেলবন্ধন।
সুনামগঞ্জের রাজনীতির মূল কেন্দ্রস্থল তখন ছিলো পুরান কলেজের সামনে। পুরান কলেজ সুনামগঞ্জের কেন্দ্রস্থলে। একে টাউন হলও বলতো। বিকেল হলেই এখানে বিভিন্ন গ্রুপে ছাত্র জমায়েত হতো। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ টগবগে সব যুবক। তার অনতিদেূরে ছিলো আলেয়া ফার্মেসী। আর ন্যাশনাল ফার্মেসী। একটা বরুণ দার ভাইয়ের আর একটা ভূপতি দাদার ( ধ্রুব এষের বাবার)। এই দুই ফার্মেসীতে বসতেন মধ্যবয়স্ক নেতারা। সব দলের নেতা। এই কাফেলায় আমার আব্বা প্রতিদিনের সদস্য। আর আমি উনার সঙ্গের বাহন। সব সময় উনার সঙ্গে থাকতাম বলে অনেকে আমাকে উকিল সাবের ছেলে বলে খ্যাপাতো। চাচারা স্নেহও করতেন। আমার আব্বার সঙ্গে থাকার দুটো কারণ ছিলো। এক আব্বা অসুস্থ ছিলেন। উনি ঘাড় ঘুরাতে পারতেন না। অফিস সময়ের পর যখন বেরোতেন আম্মা অনেক সময় আমাকে সংগে দিতেন কিছু দরকার পরে কি না দেখার জন্যে। ৬৮-৭০ এ যেতাম আবেদিনের বাহন হয়ে। আব্বা অফিস থেকে আসার পর বাইরের কাপড় পড়ার পর সে চিৎকার জুড়তো সঙ্গে যাওয়ার জন্যে। পাঁচ মেয়ের পর এক ছেলে। ফেলে যেতে পারতেন না। তাই আমার কোলে চড়ে যাওয়া আর সেই সুবাদে বড়দের বড় বড় কথা, ছাত্রদের আন্দোলন সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়ে যায়।
আরও কয়েক জায়গায় এই নেতারা বসতেন। বাসস্ট্যান্ডে আজাদ মামার বাসার সামনের দোকানে, হাছননগরে ভানু’দা দের বাসার সামনে, খোকন চৌধুরীর ফার্মেসীতে, হোসেন বক্ত সাহেবের পয়েন্টের দোকানের সামনে আর মিনু ভাইদের বাসায়। কি কথা হতো কি প্ল্যান হতো কিছুই বুঝতাম না শুধু বুঝতাম সবাই বড়ই উত্তেজিত। আমাদের পাড়াটা ছিলো রাজনীতির আখড়া। যেহেতু আমি এই পাড়ার বাসিন্দা তাই এই পাড়ার প্রতিটা ঘরের খবর জানতাম। ছাত্রদের আখড়া মানিক কোরেশীর বাসা, একটু ভিতরে আরেক রাজনীতিবিদ হোসের বক্ত মামার বাসা। তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জে বড়দের রাজনীতির মুরব্বী। আওয়ামী লীগ করতেন। পোর্টফোলিও কি ছিলো মনে নাই তবে উনি সুনামগঞ্জ শহরের একজন অভিভাবক হিসাবে কাজ করতেন। সব দলই উনার কথা মান্য করতো। ছাত্রদের নেতা ছিলেন দাদা গোলাম রব্বানী, নাসির ভাই, হুম্য়াূন ভাই, সমছু ভাই, মতিউর মামা, দাদার সঙ্গী আবু আলী মামা। তিনি কোন দল করতেন না। কিন্তু দাদার সঙ্গেই থাকতেন। ছাত্রলীগে সুজাত ভাই, তালেব ভাই, শাহী মামা, কালা সফিক, সুফী মামা। মিছিল বের হলেই দেখা যেতো শত শত ছেলে, সবাই ছাত্র। খসরু ভাই তখনও স্মার্ট হয়ে পুরান কলেজের সামনে আসতেন। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতেন। মিনু ভাই, মিন্টু দা সুরেশ দা এরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। মিছিল বের হলে লাল শার্ট গায়ে মতিউর মামাকে সবার আগে দেখা যেতো। তিনিও ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। কালা সফিক ছিলো খুব প্রাণবন্ত। শাহী মামারা খুব তৎপর। মেয়েদের মধ্যে রানী দি তখন বড় নেত্রী। নিরুপমা দি, বানী দি, সঞ্চিতা দি এরা তখন সরবে মিছিল মিটিং এ উপস্থিত। সঙ্গে আমরা পিচ্ছিরা। ওসির মেয়ে রুবি, সেও সম্পৃক্ত আন্দোলনে। ছয়দফা দেয়ার কারণে শেখ মুজিবকে জেলে নিয়ে গেছে। তাকে বের করতেই হবে। স্লোগান প্রতি সন্ধ্যায়- ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো শেখ মুজিবকে আনবো’ ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’। কত ধরনের স্লোগান। ‘স্বৈরাচারের কালো হাত ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও’। ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না। স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো এক সাথে’।
(চলবে)