আসাদ মনি
শহীদ তালেব উদ্দিন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্র ছিলেন। তৎকালীন মহকুমা ছাত্রলীগের সম্পাদক ছিলেন। এই যোদ্ধার কন্ঠে জয় বাংলা স্লোগানে মানুষ স্তম্ভি ফিরে পেতো। পাকবাহিনী তালেবকে ধরার পর শুরু করে প্রকাশ্যে ভয়ংকর নির্যাতন। স্থানীয় রাজাকাররাও তার প্রতি পাক আর্মিদের আরো ক্ষেপিয়ে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
শহীদ তালেব উদ্দিন ১৯৬৯ সনে এসএসসি পাশ করে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হন। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে তিনি সাংগঠনিক কাজ করতেন। অক্টোবরে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। তার বাড়ি দিরাই উপজেলার হাতিয়া গ্রামে।
একাত্তরের ২৭ নভেম্বর তালেব সুনামগঞ্জ শহরতলীর সীমান্ত এলাকা মঙ্গলকাটা এলাকায় যুদ্ধ করছিলেন। এখানে তিনি সম্মুখযুদ্ধে অবর্তীণ হন। পাক বাহিনীর এলোপাতাড়ি আক্রমণে তালেবের সহাযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এসময় তালেব চলতিনদী পাড়ি দিতে গিয়ে বালুচরে আটকে যান। এই সুযোগে পাক আর্মিরা তাকে ধরে এনে নির্যাতন করতে করতে জুবিলী স্কুলের মাঠে প্রদর্শন করে এই যোদ্ধাকে।
বিকাল ৩ টা থেকে পাকিস্তানি আর্মি ও স্থানীয় রাজাকারদের সভা শুরু হয় স্কুলের মাঠে। পাকবাহিনীর মেজর সরোয়ার আসার পর মাইকে ওরা ঘোষণা দেয় মহকুমা ছাত্রলীগের সম্পাদক তালেব উদ্দিন ধরা পড়েছে। বিকাল সাড়ে ৩ টায় বীর যোদ্ধা তালেব উদ্দিনকে মাঠে নিয়ে আসে হায়েনারা। কোমড়ে ধরি বেঁধে বাঁশের বেত দিয়ে মারতে মারতে কয়েকজন আর্মি জনপ্রিয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে আসে।
সভা শেষ করে সন্ধ্যার আগে পিটিআই স্কুলে নিয়ে আসা হয় ছাতনেতা তালেব উদ্দিনকে। পথে নির্যাতন করতে করতে হায়েনারা বলে আর জয় বাংলা নয়, বল ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। সংগ্রামী তালেব উদ্দিন প্রতিবারই বলেছেন ‘জয় বাংলা’।
সেই উত্তাল সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী কিশোর সাংবাদিক রওনক আহমদ বখত বলেন, পাক বাহিনীর অত্যাচারে মানুষ তখন শহর ছাড়া। সেই ভুতুরে শহরে লুকিয়ে লুকিয়ে বিভিন্ন এলাকা ঘুরতাম। আমার ষ্পষ্ট মনে আছে জুবিলী স্কুলে অনুষ্ঠিত সভায় পাকবাহিনী ও রাজাকাররা তালেব ভাইকে ভয়ঙ্কর নির্যাতন করে। তখন তালেব ভাই সভায় লোকজনদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছিলেন। শহরের অনেক পকিস্তানপন্থি লোকজন ওখানে জড়ো হয়েছিলেন। আমার কাছে এখনো এই স্মৃতি বেদনার, এখনো জীবন্ত।
২৯ নভেম্বর পাক আর্মিরা শহর ছাড়ার পর আহত অবস্থায় তালেব উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় আহসানমারা সেতুর সামনে অমানুষিক নির্যাতন শেষে হত্যা করে লাশ ফেলে যায়। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় তার লাশ শনাক্ত করে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা-রাজনীতিবিদ আলফাত উদ্দিন মোক্তার’এর সহযোগিতায় তাঁর দাফন সম্পন্ন করা হয়।
শেষ নিঃশ^াস পর্যন্ত কন্ঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান প্রতিধ্বনি হয়েছে এই বীর শহীদের। তাঁর দেওয়া স্লোগানে ত্রাস তৈরি করেছিলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর রাজাকারদের মনে। তালেব উদ্দিন নেই, তিনি রেখে গেছেন আমাদের জন্য স্বপ্ন। সে স্বপ্ন আমাদের বাস্তবায়ন করতে মুক্তিযুদ্ধের আর্দশ লালন করতে হবে। চলবে..
সূত্র: সুনামগঞ্জ কলেজের বিস্মৃত যোদ্ধা শহীদ মুহম্মদ আলী আসগর : শামস শামীম


