এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
সেই পাটনী বৌকে নিয়ে আর ছেলে মেয়েদের নিয়ে সে আমাদের বাসায় উঠেছে। আমাদের বাড়ীর সবাই চুপ। কখন বাড়ী পুড়িয়ে ফেলে সেই চিন্তায় তটস্থ। নিরীহ দুই চাচাকে রেখে সবাই ফেরার। তার রাজাকার বাহিনী প্রায় প্রতি গ্রামে হানা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ভয় দেখানোর জন্যে নাকি পাক আর্মি নিয়েও যায়। যে গ্রামে যায় সেই গ্রাম লন্ডভন্ড কওে চলে আসে। হারুন মামু আর সোনা মামু ছাড়া গাগলীর প্রায় প্রতি ঘরের লোকই তার বশ্যতা স্বীকার কওে এসেছে মর্মে খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা আবারও ভীত হয়ে যাই।
নারায়নপুরের নৃশ:সতা
গাগলী গ্রামের পাশের গ্রামই নারায়নপুর। উজানীগাঁও থেকে যাওয়ার পথে নারায়নপুর পার হয়ে যেতে হয়। অর্থাৎ নারায়ন পুরের পর গাগলী তারপরে গনিগঞ্জ। গনিগঞ্জে অনেক পরে মুক্তিযুদ্ধাদের সনে রাজাকার আর আর্মির বেশ বড় যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু নারায়নপুরে জুনের শেস পর্যন্ত এক ঘর হিন্দু, বাড়ী ছেড়ে যায়নি। ছত্তার মিয়ার বাহনীর সাথে নাকি পাক আর্মিও ছিলো সেই গ্রামে ঢুকে লুটতরাজ শুরু করে। আর সেই হিন্দুবাড়ীতে ঢুকে সেই বাড়ীর বৌ কে রেপ করে চলে যায়। সময়টা ছিলো দুপুর। গাগলীর বাজার থেকে কিছু দুর গেলেই নারায়নপুর। বাজারের লোকেরা দৌঁড়াদৌঁড়ি করে গ্রামে ঢুকে হাপাতে থাকে। সবাই সবার মেয়ে বৌকে সামলানোতে ব্যস্ত। সবাই বলাবলি
করতে থাকে এই গ্রামেও আসবে। আর এরজন্য আম্মার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল উঠে। কারন আম্মা প্রতি রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনেন। আর শুধু শুনেনই না। অনেক লোক জমায়েত হয়ে যায়। এই খবর নি:শ্চয়ই ছত্তার মিয়া পর্যন্ত পৌঁছেছে। কাজেই এই এলো বলে। বাড়ীর মেয়েদের পিছনের বন জঙ্গলের ভেতরে লুকাতে বলা হয়। আপাকে মশকুলবুই এর একটা শাড়ী পড়িয়ে পাঠানো হয়। মেয়েরা যুবতী বৌয়েরা নিজেদেও ইজ্জত বাঁচাতে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে যায়। অনেক পচা জিনিষ পার হয়ে। সবাই কাঁপতে থাকে। ভয়ের অপেক্ষা শেষ হয় না। নারায়নপুর থেকে গুলির শব্দ শুনা যায়। আমরা সবাই দিশেহারা। ভয়ংকর কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছি। কিন্তু না কেউ আসেনি। বাজারের দিক থেকে একজন দৌঁড়ে এসে বলে আর্মিরা চলে গেছে। বাড়ীঘর লুট করে আর কার এক বিধাব বৌকে রেপ করে ফেলে গেছে। সবাই নারায়রপুরের দিকে যায়। আমিও যেতে চেয়েছিলাম। আম্মা জোর করে হাত ধরে রাখেন। আর টুটু করে ঘুরার উপর নিষেধাজ্ঞা দেন। বিকালে জঙ্গল থেকে মেয়ে বৌদের বাড়ীতে ফেরত আনা হয়। মশার কামড়ে আর কাঁদায় বেতের কাটায়, এদেও দেখার মতো অবস্থা হয়েছে। বড় না হওয়ার জন্যে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই। আর এতো দু:খের মাঝেও এদের অবস্থা দেখে হেসে ফেলি। সবাই বকা দেন। যারা নারায়নপুর গিয়েছিলো তারা যে বর্ননা দেয় তা লিখার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। গ্রামের সব সম্পন্ন বাড়ীতে হানা দিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে গেছে। হিন্দুহাটির সবাই চলে গেছে বাড়ীর মায়া ত্যাগ করে, শ্বশুর তার বিধাব পুত্রবধুর রয়ে গেছিলো। বৌটাকে নাকি এমন ভাবে রেপ করেছে যে বৌটির দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। গ্রামের লোক পলো (এক ধরনের বেতের খাঁচা বৃষ্টি এলে শুকানো ধান ঢাকা হয় আবার অসুস্থ হলে বাহন হিসাবে ব্যবহৃত হয়) তে করে তাকে অন্য গ্রামে নিয়ে গেছে। সোনা চাচা নিজে গিয়ে দেখে এসে অনবরত মাথায় পানি ঢালছেন। আর হাউমাউ করে কান্না করছেন। অবাক বিস্ময়ে বড়দের এই পেরেশানী দেখছি আর অজানা ভয়ে কাঁপছি। পরের দিন বাজারের দিকে গিয়ে চুপিচুপি আমি ঐ বাড়ীতে গেছিলাম। বিরান বাড়ী চারিদিকে সব তছনছ। মানুষের জীবন ধারনের ছোটখাট উপকরন চারিদিকে ছড়ানো ছিটানো। এর মায়ায় বৃদ্ধ গ্রাম ছাড়েনি। তার খেসারত দিতে বলি হয়েছে তারই সামনে তার বিধাব পুত্রবধুকে। জানি না এই বৌটির পরে কি হয়েছে। নিশ্চয়ই আর স্বাভাবিক জীবন তার হয়নি। এরূপ নাম না জানা হাজারো মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীনতা। আমরা কি তা সঠিকভাবে লালন করছি ?
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রশুনার জন্যে রাজাকারদের হম্বিতম্বি
বড় মামা নিজের জীবন বিপন্ন করে আমাদের বাসা থেকে পাক আর্মি আসার প্রাক্কালে আব্বার যে রেডিওটা নিয়ে এসেছিলেন এটাই ছিলো আমার আম্মার সাথী। শোকে পাথর এই মহিলাকে জীবন্ত মনে হতো রেডিওর খবর শুনার সময়। বিভিন্ন চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে মধ্য জুনে আম্মা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও স্টেশন পেয়ে যান। আর প্রতি রাতে সন্ধ্যা থেকে উনি যেনো প্রাণ ফিরে পেতেন। প্রথমে আস্তে আস্তে শুনতেন। কিন্তু ক্রমে বাড়ীর লোকজন কেউ কেউ এই বেতার কেন্দ্র শুনার জন্য আসতে থাকেন। বিশেষ করে নবাব ভাই, কামাল চাচা, হারুন মামু, আর সোনা চাচাজী। নবাবভাইয়েরবয়স ১৭/১৮ যিনি মাছ মারতে লোক নিয়ে এসে নৌকায় পার করতেন, তিনি আম্মার চৌকির পাশে গুটিশুটি হয়ে বসে থাকতেন। আর খবরের ধারা বর্ননার সাথে চিৎকার দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করতে চাইতেন। কামাল চাচা আব্বার দূর সম্পর্কের মামাতো ভাই এই বাড়ীর ছেলে নন। পাশের বাড়ীর এদের চাচাতো চাচাদের বাড়ীর। সুনামগঞ্জ কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়তেন। হোস্টেলে থাকতেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় বাড়ী এসেছিলেন। আর আটকে গেছেন। বড় শখ ছিলো যুদ্ধে যাওয়ার কিন্তু তার মা গলায় আক্ষরিক অর্থে দড়ি দিতে গেলে তিনি নিবৃত হন। (অবশ্য তার মা যুদ্ধের পরে গলায় দড়ি দিয়েই আত্মহত্যা। তিনি মতিউর মামার ক্লাসমিট ছিলেন বলে আম্মার খুব আপন হয়ে যান। তিনিও সন্ধ্যা হলেই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র শুনার জন্যে আমাদের ঘরে এসে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতেন। তার মিষ্টি ব্যবহার আমাদের মন ছুঁয়ে যেতো। তিনি আমদের রান্নাবান্নায় সাহায্যও করতেন। আমাদেও সবার প্রিয় হয়ে যান। তিনিও স্বাধনি বাংলা বেতার শুনার জন্যে পাগল ছিলেন। হারুন মামু সমগ্র চেতনা উজার করে শুনতেন। আর বারবার বলতেন রব্বানীর কথা কিছু কইলো কিনা। সোনা চাচাজী স্বাধীনতা পাগল মানুষ তিনি নীরব থাকতে পারতেন না। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমন শুনলে চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশ করতেন। বিশেষ করে ‘চরমপত্র’ আর ‘জল্লাদের দরবার শুনার সময় তার হিতাহিত জ্ঞান থাকতো না। অন্যরা শুনলে যে সমস্যা হতে পারেতা তিনি চিন্তাও করতেন না। আমরা আম্মার পাশে বসে এই আশার বানী শুনতাম আর স্বপ্ন দেখতাম এইতো দেশ স্বাধীন হবে আমরা আবার আমাদের নিজ আলয়ে যাবো। পাবো প্রিয় দাদা, নানা ভাই, ছোট মামা, মতিউর মামাকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হলো মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী কওে তোলার এক অসাধারন সঞ্জীবনী। আর দেশে থাকা মুক্তিপাগল মানুষদের স্বপ্ন দেখার বাতায়ন। কিন্তু এ করনে আম্মা অচিরেই অনেকের চক্ষুশূল হয়ে যান। আর এ খবর ঠিকই ছত্তার মিয়ার বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায় যে, সোনাওর আলী সাহেবের বিধাব স্ত্রী গাগলীতে বসে লোকজন সহকারে এই নিষিদ্ধ বেতার শুনেন এবং মানুষকে উজ্জীবিত করেন। কে বা কারা এই খবর দিয়েছে আমরা বুঝতে পারলেও ঐ সময় করার কিছু ছিলো না।
নারায়নপুরের ঘটনার পর সবাই একটু নিশ্চিন্ত ছিলো হয়তো গাগলীতে রাজাকার বা আর্মি আসবে না, কারণ ছোট্ট এই গ্রামে কোন হিন্দু পরিবার নেই। কিন্তু এই ঘটনার তিন/চারদিন পর গাগলী ঘাটে এক ছোট্ট লন্চ ভিড়ে। আর মানুষ দৌঁড়াতে থাকে আর্মি এসেছে আর্মি এসেছে রব তুলে। ঐ দিন সময় ছিলো, বৌ ঝিদের নিরাপদ দূরত্বে পাঠানো হয়েছিলো। কিন্তু আজ যে সময় নেই! ঘাটে এসে নেমে গেছে হানাদার বাহিনী! তথাপি মেয়েদের পিছনের দিকে দ্রুত সরানোর জন্য বড়রা মরিয়া হয়ে যান। মেয়েরার জানের তড়াশে কে যে কিভাবে দৌড়ায় বর্ননাতীত। মেয়েদের দৌঁড় শেষ হয় উঠে নাই, উঠানে এসে দাঁড়ায় একপাল খাকি পোষাক পড়া সশ¯্র সৈন্য। সবাই জড়ো হয়ে দোয়া দরুদ পড়ছে। কিন্তু দেখা যায় এই দলে পাক আর্মি নাই। কেবলই রাজাকার। সবার জানে পানি আসে। প্রাণ সংহার হয়তো হবে না। (চলবে)
এরা ছত্তার মিয়ার বাহিনী। দলনেতাকে আমি চিনি। ছত্তার মিয়ার চাচা বেশ বয়স্ক লোক। আমার আব্বার স্কুল জীবনের বন্ধু। পেশায় শিক্ষক। এখন রাজাকার কমান্ডার হয়েছেন। বাবার বন্ধু বলে এখানে আমি তার নাম নিচ্ছি না। উনি প্রায়ই আমাদের সুনামগঞ্জের বাসায় যেতেন। আব্বার বাল্য বন্ধু হিসাবে অনেকবার উনাকে আব্বা আমাদের সালাম করিয়েছেন। কাজেই চিনি ভালো করেই। উনি এসে প্রথমে উঠানে দাঁড়িয়ে সব পুরুষ লোকদের ডাকেন এবং পাকিস্তানের জয়গান গাওয়ার জন্য সবাইকে একত্রিত থাকতে বলেন। আর বলেন, তার কাছে খবর আছে এ বাড়ীতে দলবেধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনা হয়। যারা এই রেডিও শুনবে তাদের গুলি করে মারার আইন হয়েছে। গাগলীর তালুকদার বাড়ী যেহেতু সম্ভ্রান্ত বাড়ী তাই তিনি কাউকে মারবেন না, তবে ভবিষ্যতে কেউ এ কাজ করলে শাস্তি পেতে হবে। তার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য সবাই মাথা পেতে নেয়। জান যে দিতে হচ্ছে না সে জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে তাকে ও তার বাহিনীকে আপ্যায়ন করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবার শেষে তিনি বলেন, এই বে আইনী কাজ কে করছে তার কাছে খবর আছে তিনি তার সাথে কথা বলতে চান।
আম্মা আর্মি আসার খবরে আপাকে মেয়েদের সঙ্গে বিদায় করে আমাদের চারজনকে ধরে চৌকিতে বসাছিলেন রাজাকারদের এতো বক্তৃতা তার কর্ণকুহরে ঢুকেছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না। তিনি আমাদের ঘরের বাইরের বারান্দায় বসেই বক্তৃতা ঝাড়ছিলেন। ঘরে ঢুকে তিনি আব্বার জন্য আহাউহু করেন। এরপরই আম্মাকে বলেন, যে তিনি বেআইনীভাবে লোকজন সহকারে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনেন, সে খবর শুনেই তারা আজ এই অভিযানে এসেছেন। এই সাহসটা আম্মার করা উচিত না, কারন উনার স্বামী কমিউনিষ্ট ছিলেন, তা সবাই জানে, উনার বাপ চাচা ইন্ডিয়াতে, আর রব্বানী সমস্যা তো আছেই। কাজেই পাকআর্মির কাছে খবর গেলে উনাকে তুলে নিয়ে চলে যাবে। নেহাত তিনি আব্বার বন্ধু তাই কিছু করছেন না ভবিষ্যতে করতে বাধ্য হবেন। অনেক হম্বিতম্বি করার পর আমাদের বাইওে যেতে বলেন। আমি আম্মার দিকে তাকাই। আম্মা বলেন, আমার বাচ্চারা কেন বাইরে যাবে। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। আম্মা সোনা চাচা থাকবে বলে জানান। আমি শাম্মীকে নিয়ে বাইরে আসি। আবেদীন, লাকি আর সোনা চাচা ভিতরে কি কথা হয় জানি না। উনি বাইরে চলে আসেন। তার সঙ্গে রাজাকারেরা এর ঘরে, তার ঘরে যায়। অনেকের পরিচিত কারও কারও আত্মীয়। চা নাস্তা খায়। যাওয়ার সময় আবারও স্বাধীন বাংলা বেতার না চালানোর এত্তেলা জারী করে রাজাকাররা চলে যায়। মেয়েদের কে আবার জঙ্গল থেকে ডেকে আনা হয়। সারা বাড়ী শুনসান। আম্মা ঠিকই রাত্রে একা একাই খুব আস্তে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতে থাকেন। আমি আর আপা কান পাতি। এই কঠিন সময়ে একটু সময় শ্বাস নেয়ার এই রেডিও শুনা বন্ধ করা যে কি অমানবিক তা বুঝানো যাবে না। (চলবে)