সুনামগঞ্জের মেয়ে

সাদিয়া চৌধুরী পরাগ
সদ্য সমাপ্ত পবিত্র লাইলাতুল মেহরাজ- এর মাত্র দু’দিন আগে, এ উপমহাদেশের নারী সমাজ উন্নয়ন ও তাঁদের আত্ম-সচেতনতায় জাগিয়ে তোলার পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখওয়াত হোসেনের পরবর্তী অত্যুজ্জ্বল আলোক-বর্তিকা, সে এক মহতি মহানের মুখ হঠাৎ করে চোখের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে।
তিনি গর্ভধারিনী না হলেও বলা যায়, একই সমতলে অধিষ্ঠিত। তাঁর সঙ্গে নাড়ির বন্ধন ও রক্ত প্রবাহের ধারায় নয়, আত্মার নিবিঢ় টান, মন-মানসিকতা একই প্রকার বোধের উপলব্ধি থেকে এই নির্মল সত্যের স্বীকৃতি।
ক’দিন আগে, ¯েœহ-দানি ও কর্তব্য পরায়ন নারী, সুনামগঞ্জের মেয়েটির খোঁজ নিয়েছিলেন। অন্তর উদ্বেলিত মমতা ও দায়িত্ববোধে জেনে ছিলাম তাঁর অসুস্থতার কথা। এ কারণে তাকে কন্যার বাসায় অবস্থান নিতে হয়েছে এবং এ-ও জেনেছিলাম, মেয়েটি তাঁর ফ্লাটে ফিরে আসার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে।
ফোনটা হাতে রেখে মেয়েটিকে বললেন, তুমি এরকম করছো কেন, বোন..। শরীর পুরোপুরি ঠিক না হলে-এভাবে একা বাসায় যাওয়া ঠিক হবে না। তাঁর কন্ঠে ¤্রয়িমান কথার প্রকাশ। শারীরিক দুর্ব্বলতার সুস্পষ্ট ছাপ। মেয়েটি বেশ উৎকন্ঠা বোধ করে বলে, আপা! আপনাকে দুর্ব্বল মনে হচ্ছে…কোনও অসুখ-বিসুখ হয়নি তো? আশংকা সহজেই স্বীকার করে বললেন, বয়স হয়েছে…কিছু না কিছুর ঘায়েল সহ্য করতে হবে…তাছাড়া ভ্যাঁপসা গরমে ঘেমে ঘেমে ঠান্ডা লেগে গেছে…।
এই তো, পবিত্র লাইলাতুল মেহরাজ-এর দু’দিন আগে সম্ভবত: এ কারণে তাঁর জন্য ভীষণ অস্থিরতা বোধ হতে থাকে। ইদানিং বার্ধক্যতার সুযোগে রোগ-বালাই প্রতিনিয়ত তাঁকে আক্রমণ করছে… তিনি অফিসে যেতে পারছেন না। তাঁকে নিয়ে এক ধরনের দুর্ভাবনা মাঝে মঝেই মন বিষন্ন করে। সেদিন কোন অশনিসংকেত হৃৎপিন্ডের দাপাদাপি বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে দ্রুত টেলিফোন যোগাযোগ করা হলে ও পাশ থেকে সেই মমতাময়ীর সুযোগ্য সন্তান শাঁখী জানালো, আম্মা একেবারেই ভালো নেই…। তাঁর নিউমেনিয়া হয়েছে। তাঁকে হাসপাতালে নিতে রাজী করতে পারছি না।
হায় ঈশ্বর! এ যে এদেশের নারী-সমাজের নক্ষত্র, সবে-ধন নীলমনি হারানোর পূর্বাভাষ। আর কে আছে, তাঁর শূন্যতা পূরণের এমন কেউ? নিজেদেরে নিয়ে ফাঁকা ঢাক-ঢোল পেটানোর অহমবোধ এ সমাজে। না-না প্রশ্ন, উদ্বিগ্ন উৎকণ্ঠায় ঝুলে থাকা সময়ে পত্র-পত্রিকার বরাত দিয়ে জানা গেলো, তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
সন্ধ্যার পর মহিয়সসীর ছোট কন্যা মোবাইল করে। উথাল কান্নায় ভেঙে পড়ার মত অবস্থায় সে বলতে থাকে, খালাÑ মা’র অবস্থা আশংকাজনক…। খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে..। পালসবিট নিচে নেমে যাচ্ছে..। তাকে কোন শক্তি বলে স্বান্তনা দেওয়া যায়। পায়ের তলার ভিত টালমাটাল নড়ে উঠছে…। যে ভিত আঁকড়ে সুনামগঞ্জের মেয়েটি আয়ূষ্কালের সংকটগুলো কাটিয়ে উঠার দু:সাহস পেয়েছে…, ছায়াদানি সেই বিশাল বৃক্ষটি উৎপাটিত হতে চলেছে…? সে তো শুধু একটি দুটি নারীর পাশে দাঁড়াতে এ মাটির গ্রহে আবির্ভূত হয়নি…এ দেশের প্রতিটি নারীর প্রতিভা বিকাশ ও স্বাবলম্বী করণ এবং তাদের ক্ষমতায়নে দিশারি বা বাতিঘর রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সে নারী বিস্ময়কর ব্রতচারি।
সুনামগঞ্জের মেয়েটির প্রজ্ঞা ও স্বচ্ছ-বোধ বিবেকের আয়নায় এবং নিরপেক্ষ বিচারে তাঁর অবস্থান এ রকমই সুষ্পষ্ট। তাঁকে নিয়ে যতবার ভাবা যায় ব্যাপারটি বিষ্ময় বিমোহিত করে। বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার নদীনালা-খালবিল পরিবেষ্টিত এক দেহাতি মাটির কন্যা, নূরজাহান বেগম। গাঁয়ের মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি আদরের দুলালি, নূরী। তাঁর মা ফাতিমা খাতুন। বাবা, নাসির উদ্দিন।
মা-বাবার একমাত্র সন্তান, নূরীকে নিয়ে তাঁদের সংসার জীবন। বাবার আয়ের উৎস একটি ছোট্ট বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। মা, গৃহিণী। একমাত্র কন্যাকে নিয়ে তাঁর সকল স্বপ্ন স্বাধ। নূরীকে কোলে বসিয়ে চুলে বিনুনি বাঁধেন, কানে দুল নাকে নাক ফুল দিয়ে ফুটফুটে মেয়েটিকে সাজিয়ে রাখেন। মা’র কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে নূরী খেলার সাথীদের সঙ্গে খেলে মাঠে ঘাটে খালের ধারে ঘুরে বেড়ায়।
তাঁর বাবা নাসির উদ্দিন চাকরিজীবী হলেও তাঁর চিন্তা চেতনায় ছিল সে যুগের অনগ্রসর মুসলমান সমাজকে পুণর্জাগরণ ঘটানো। এই ভিন্নমুখী আদর্শের আগমন ঘটে, মূলত: মুসলমানদের প্রতি বৃটিশ শাসকের বৈমাত্রেয় সুলভ দুর্নীতির প্রবণতা দেখে। অথচ, এই মুসলমানদের হাতে উপমহাদেশ শাসিত হয়েছে সাম্যনীতির ভিত্তিতে। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অবদানে তাঁরা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে।
তাঁর আদর্শিক চেতনা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করার প্রেক্ষাপটে জনাব নাসির উদ্দিন চাকরীতে ইস্তফা দিয়ে  কোলকাতায় ফিরে আসেন ও সওগাত নামক আধুনিক ও মুক্তচিন্তা ধারার ম্যাগাজিন সম্পাদনার জন্য তোড়জোড়ে কাজ চালাতে থাকেন। এসময় আকস্মিক খবর পৌঁছে,গাঁয়ের বাড়ির ¯্রােতস্বী খালে ডুবে তাঁর কন্যা নূরী অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। পিতা নাসির উদ্দিন সকল কাজকর্ম স্থগিত রেখে বাড়ি ছুটে যান এবং কিছুদিন অবস্থান করে স্ত্রী ও কন্যাকে কোলকাতা নিয়ে আসেন।
গায়ের দুলালি মেয়ে নূরী-নূরজাহান বেগম নামে পরিচিতির পালা সেই থেকে শুরু। কোলকাতায় তাঁকে এনে ¯েœহ-বাৎসল্য ও আধুনিক মন-মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ পিতা তার চুলের ছাঁট হাল ফ্যাশনের করে নাকফুল কানের দুল খুলে ফেলেন এবং তাঁকে কোলকাতার একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করে দেন।
ঝিনুকের শক্ত আবরণ থেকে মুক্তা প্রকাশের মত গেঁয়ো খোলস ছেড়ে নূরী পরিচিতি পায়  নূরজাহান বেগম হিসাবে, আর পেছনে তাকায়নি। সে ম্যাট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট শেষে লেডি ব্রেবোন কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন লাভ করে এবং পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে পিতা নাসির উদ্দিনকে সওগাত প্রকাশনায় সহযোগিতা দিতে থাকে। উপমহাদেশ ভাগাভাগির পূর্বকালে তিনি সুযোগ্য কন্যার সহযোগিতায় মহিলা সংখ্যা সওগাত প্রকাশ করেন। এতে শুধুমাত্র নারী লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতবানদের সচিত্র প্রতিভা পরিস্ফূটন হলে ধর্মান্ধদের কাছে তিনি নানাভাবে অপমানিত হতে থাকেন। জনাব নাসির উদ্দিন এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হলে পরবর্তীতে মহিলাদের জন্য বেগম পত্রিকা উন্মোচন করেন।
প্রথম দিকের সাপ্তাহিক বেগম এর সম্পাদক কবি বেগম সুফিয়া কামাল ও সহ-সম্পাদক নূরজাহান বেগম নির্বাচিত হন। কিন্তু অল্পদিন যেতে না যেতেই, নূরজাহান বেগম উক্ত পত্রিকার সম্পাদকের পদ লাভ করেন এবং সেই সময় থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগম নামে অত্যুজ্জল পরিচিতির আসনে সমাসীন ছিলেন। এখানে বলা বাহুল্য হবে না যে, কোলকাতা থেকে বেগম প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৫৪ সালে এই সাপ্তাহিক ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়।
যদি উপমহাদেশ ভাগাভাগির পরের দিক, ১৯৫৪ সাল থেকে বেগম এর প্রকাশনার হিসাব কষা হয়, তবে বলা যায় এই ৬২ বৎসরে হাজার হাজার নারী অনুপ্রাণিত হয়েছেন নূরজাহান বেগম এর পত্রিকার সহায়তায়। গৃহে পরিচ্ছন্ন স্বাস্থ্যসম্মত খাবার রান্নার পরামর্শ দান, শিশুমঙ্গলে শিশুদের প্রতি যতœবান হওয়া, সেলাই, মহিলা জগতের খবর, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি লেখায় পরিপূর্ণ বেগম, নারী সমাজকে দিনে দিনে অগ্রগতির ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়েছে। নারীরা এখন প্রায় সর্বক্ষেত্রে দক্ষতা অনুযায়ী প্রবেশ করছে।
আর এ সকল কিছু ঘটেছে অবরোধবাসী নারীদের প্রতিকূলতার কপাট যিনি উন্মুক্ত করণে সংগ্রাম করে গিয়েছেন, সেই মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কারণে। তাঁর আলোক-বর্তিকার আলোয় পথ ধরে ছুটে এসেছেন বেগম সুফিয়া কামাল, ড. ফাতেমা সাদেক, অধ্যক্ষ ফজিলাতুননেসা এবং আরো অনেকে। বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগম আরেকটা পৃথক ভূমিকা পালন করেন। তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে মনেপ্রাণে নদীর মতো বিলিয়ে দিয়েছেন, আড়ালে আবডালে থাকা কর্মদক্ষ ও প্রতিভাবান নারী সমাজে। তাদের সুকুমার বৃত্তি বা গুণাবলী তুলে ধরার জন্য বেগম-এ বিভিন্ন বিভাগ খুলে দিয়েছেন। সে কারণে সাহিত্য জগৎ উজ্জ্বল করেছেন, রাবেয়া খাতুন, মরহুম মাফরোহা চৌধুরী, শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা ও আরো অনেকে ফটো সাংবাদিকতায় খ্যাতি অর্জন করেন। সাঈদা খানম, তিনি সে যুগেই বেগম-এ ফটো সাংবাদিক রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। অত্যন্ত দু:সাহসিক পদভারে।
বেগম এর বদৌলতে এদেশে হাজার হাজার নারী লেখক সৃষ্টি নূরজাহান বেগম এর মহৎ অবদান। এ সৃষ্টি থেকে নব নব সৃষ্টির উদয়নে তাঁর নেপথ্য ছোঁয়া অস্বীকার করা ধৃষ্টতার নামান্তর। তাঁর অমরতার পরিস্ফূটন এখানেই। তিনি না ফেরার দেশে (২৩ শে মে ২০১৬) ফিরে গেলেও এদেশের নারীদের অন্তরে চির জাগ্রত হয়ে থাকবেন। কারণ তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। কবিগুরুর ভাষায়,‘এনেছিলে সঙ্গে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরনের পরেও তা করে গেলে দান।’ সেই তাকে হারিয়ে সুনামগঞ্জের মেয়ে নি:স্ব রিক্ত হলেও সম্পাদক বেগম এর কর্ম জীবন তাঁকে বড় স্বান্তনা দান করে এ বয়সেও প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। সৎ কর্ম বেঁচে থাকে সময়ের আলোকে।
সুনামগঞ্জের মেয়ে এ বাণী চিরন্তন উপলব্ধি করছে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে।
লেখক: চিন্তক ও প্রাবন্ধিক।