উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গ জনপদ সুনামগঞ্জ

মরতুজা আহমদ
আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গণমাধ্যমের বিশাল ভূমিকার কথা আমাদের দেশের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের জন্যই তা সুবিদিত। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কথা আসলে গণমাধ্যমের গুরুত্বটা আরো বেড়ে যায়। কারণ প্রত্যন্ত জনপদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গণমাধ্যম বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আমাদের দেশে গণমাধ্যম বলতে এক সময়ে ছিল শুধু প্রিন্ট মিডিয়া, যার ইতিহাস মূলত দু’শ বছরের। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যদি শুধু বেতারের কথা ধরি, একশ’ বছর ধরে তা এদেশে চলছে। টেলিভিশনের শুরু গত শতকের মধ্য থেকে, আর এরই মধ্যে যুক্ত হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম নামীয় গণমাধ্যমের বিশাল এক জগৎ।
ইতিহাসের এ গতিধারাতে আমরা দেখি দেশের উন্নয়নে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উন্নয়নে গণমাধ্যম এক নিরন্তর ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ১৯৭০ সালে ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপে মহাপ্লাবন হয়েছিল, তিনদিন পর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশবাসী জানতে পেরেছিল একরাতে এসব অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছে। এরপর দুর্যোগ এলাকায় কোন জায়গায় কোন খাবার ও কতখানি পানীয় জল প্রয়োজন তাও তৎকালীন সরকারকে গণমাধ্যম থেকেই সংগ্রহ করতে হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইলেকট্রনিক মিডিয়া তাদের বহুল বিস্তৃত জেলা-উপজেলায় কর্মরত গণমাধ্যম কর্মী দ্বারা প্রতিনিয়ত দেশের সকল প্রান্তের হালনাগাদ সংবাদ পরিবেশন করছেন যা উন্নয়নের অগ্রগতিকে গতিশীল করছে।
এছাড়া উন্নয়ন ধারায় জনসম্পৃক্ততা আনয়নে বাংলাদেশের কমিউনিটি রেডিওগুলোর অর্জন ইতোমধ্যে সকল মহলের দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছে। কমিউনিটি রেডিওগুলোর মূল লক্ষ্য জনগণের দোরগোড়ায় স্থাপিত এই গণমাধ্যমের সাহায্যে দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজেদের কথা সরাসরিভাবে বলার সুযোগ দেয়া। ইতোমধ্যে কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর এই কমিউনিটি রেডিওগুলো সাধারণ মানুষকে সোচ্চার হওয়ার সে সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে, প্রাকৃতিক দূর্যোগের আগে ও পরে এমনকি দুর্যোগ চলাকালীন কার্যকর মাধ্যম হিসাবে সেবা দিয়ে চলেছে। প্রলয়ংকারী ঘূর্নিঝড় ‘মহাসেন’ ও ‘কোমেন’ এর সময় উপকূলীয় অঞ্চলে স্থাপিত কমিউনিটি রেডিওগুলোর দেশে-বিদেশে ভূমিকা সকল মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মধ্যে সুনামগঞ্জ অন্যতম। সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এখন বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে গণমাধ্যমের কল্যাণে। এটা আমি বলার জন্য বলছি না, প্রকৃতপক্ষে বাস্তব অবস্থাটাও তা-ই। তিন হাজার ৭৪৭ বর্গ কিলোমিটারের বেশি আয়তন সমৃদ্ধ এ জেলায় প্রায় ২৫ লক্ষ লোকের বাস। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৬৫৯ জন। পুরুষ ও নারীর অনুপাত প্রায় সমান সমান, ১০১ : ১০০।
বাংলাদেশের অন্যান্য জনপদের মতো সুনামগঞ্জ জেলা অনেক দিক থেকেই অন্যতম শীর্ষ এক স্থানে রয়েছে। সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কারণে জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে অঞ্চলটি। চোখ জুড়ানো টাঙ্গুয়ার হাওড়, শনির হাওড়, মরমী সাধক হাছন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, রাধারমণের স্মৃতিসহ অনেক ইতিহাস নিয়ে এ জনপদ এখনো দীপ্যমান। আমাদের সুনামগঞ্জ জেলায় ২৬টির মতো নদী আছে। একটা জেলায় এতগুলো নদী, এটা একটা গুরত্বপূর্ণ দিক। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অনেক কিছু করার সুযোগ রয়ে গেছে এখানে। আর কাজটি শুধু প্রশাসনিক ভাবে হবে না, গণমাধ্যমেরও অনেক ভূমিকা রাখতে হবে।
আমাদের দেশের প্রত্যন্ত জনপদগুলোর চিত্রটি কেমন? সেখানে বিদ্যুতায়িত কতগুলো গ্রাম আছে, সাক্ষরতার হার কেমন, স্বাস্থ্য পরিচর্যার হাল কী-ইত্যাদি বিষয়েই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অনেকটা নির্ভর করে। এ উন্নয়নটা ত্বরান্বিত হয় যদি গণমাধ্যম এসব ব্যাপারে সক্রিয় থাকে। জেলার সাক্ষরতার হার ৩৫%; এর মধ্যে পুরুষ ৩৬% এবং নারী ৩৩%। এ পরিসংখ্যান আমাদের পিছিয়ে রাখছে। এ জেলায় মহাবিদ্যালয় আছে ২৬টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২০৯টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৮৫৬টি, মাদরাসা ৯৭টি। আমাদের স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাগত ও গুণগত মান আরো বাড়াতে হবে। এর জন্য জনপদের সকল পেশা ও শ্রেণির আগ্রহ লাগবে, জনমত তৈরি করতে হবে। আর এ কাজটি সবচেয়ে সহজভাবে করে দিতে পারে গণমাধ্যম। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও শিক্ষার হার জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে অনেক কম। জেলার একটা বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে হাওড় থাকায় শুষ্ক মৌসুমে শিক্ষার্থীরা কৃষি কাজ করে কারণ অনেকক্ষেত্রে শিক্ষার সুযোগ ব্যয় (opportunity cost) তাদের জন্য বেশি। আর বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল না হওয়ায় বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম হয়। এ জায়গায় আমাদের কাজ করার অনেক অবকাশ রয়েছে। আমাদের জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা যদি গ্রাম-ইউনিয়ন ধরে ধরে বিষয়টি তুলে ধরেন, তাহলে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানসহ সকলেই আরো নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পেতেন।
এ প্রত্যন্ত জনপদে মানুষের গড় আয়ু ৬২ বছর। এ তথ্য এলাকার মানুষের সংগ্রামশীলতা ও বেঁচে থাকার জন্য তার অবদানকে স্বীকার করে নিচ্ছে। আমাদের এজন্য স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে আমাদের প্রায় ৪২ হাজার টিউবওয়েল আছে, স্বাস্থ্যকর পানির জন্য এ সংখ্যাও বাড়াতে হবে। এছাড়া চাহিদার তুলনায় কম সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কোন কোন এলাকা এর প্রাধিকার পাবে গণমাধ্যম কর্মীরা তা একটা নির্দেশনায় আনতে সাহায্য করতে পারে।
প্রত্যন্ত জনপদের জন্য অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্রও দরকার। আমাদের এ জনপদে ১২টি সরকারি হাসপাতাল আছে, আর স্বাস্থ্য কেন্দ্র আছে ২২টি। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, সুনামগঞ্জ জেলায় শিশু মৃত্যুর হার হাজারে ৬২। আবার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.০২। সুতরাং এ জায়গাটিতে আমাদের আরো গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রত্যন্ত জনপদ থেকে একটি সুস্থ সৃজনশীল মেধাবী প্রজন্ম বেরিয়ে আসতে পারে।
পিছিয়ে পড়া জনপদের জন্য বিদ্যুতায়িত গ্রাম সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে খুব জোর দিয়ে থাকেন। সুনামগঞ্জে প্রায় ৪৫% মানুষ কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল যেখানে প্রায় তিন লক্ষ কৃষি পরিবার আছে। অর্থাৎ, জনপদের প্রায় অর্ধেক মানুষই কৃষি পেশার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। গ্রামে বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সবার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ না করতে পারলে জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কাজটি পিছিয়েই থাকবে। আমাদের গণমাধ্যম যদি জাতীয় এবং আঞ্চলিক এ দু’ভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন, তাহলে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় এ জনপদের জন্য বিদ্যুতায়িত গ্রাম কতো জরুরি, তা বোঝানো সহজ হবে।
সরকারি পরিকল্পনা ও নীতিতে প্রত্যন্ত জনপদের উন্নয়ন বরাবরই গুরুত্ব লাভ করে। বর্তমান সরকারও এসব জনপদের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পূর্বের তুলনায় উন্নয়ন পরিকল্পনা এখন সহজ হয়ে এসেছে। গণমাধ্যমের নতুন চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের কারণেই এখন এটা সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
গণমাধ্যম জগতে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিষয়ক নতুন বিপ্লবের কারণে দেশের নানা প্রান্ত ও নানা জনপদের মধ্যে উন্নয়ন যোগাযোগের একটি আন্ত:সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। স্বাধীন গণমাধ্যম গড়ে ওঠার এটি একটি ধাপ। স্বাধীন গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রত্যন্ত জনপদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত শিক্ষা, উন্নত সামাজিক সেবার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুস্থ ও উন্নত সমাজ গড়ে তোলার জন্য স্বাধীন গণমাধ্যম খুবই প্রয়োজন। প্রত্যন্ত জনপদের উন্নয়ন কতোটা হচ্ছে, কেমন করে হচ্ছে, দেশের সম্পদ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার শতভাগ ভালভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তার অনুসন্ধানে গণমাধ্যমই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর উপায়। উন্নয়নের জন্য যেমন অবকাঠামোগত দিক গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দরকার কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও ভাল একটি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং এর সঙ্গে প্রশিক্ষিত একটি গণমাধ্যম দলও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে, এই এগিয়ে যাওয়ায় প্রত্যন্ত জনপদগুলোকে সমানভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ সংগ্রামে দৃঢ় এক কার্যকর সহায়ক শক্তি হচ্ছে আমাদের গণমাধ্যম। একে অনুসমর্থন ও কার্যকর সহযোগিতা দান করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।
লেখক: সচিব, তথ্য মন্ত্রণালয়