পাঠাভ্যাস ও তা বৃদ্ধির উপায়

মু. আবদুর রহীম
পাঠাভ্যাস অর্থ পাঠের অভ্যাস। তাই পাঠাভ্যাস বিষয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমেই পাঠ সম্পর্কে বলতে হয়। পাঠ মানে পড়া। পাঠের সাথে আমাদের চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বাÑপাঁচ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে এ তিন ইন্দ্রিয়ই জড়িত। তার সাথে জড়িত মনও। এতগুলো বস্তু অবস্তু জড়িত যে কর্মে তা যে একেবারে তুচ্ছ হতে পারে না সে তো বলাই বাহুল্য। মানব কল্যাণের শ্রেষ্ঠ দিশারী আল কুরআনের সর্ব প্রথম উচ্চারিত শব্দটিই হলো ‘ইকরা’, অর্থাৎ পড়ো। আমাদের মনে এবং ভাষায় হাজার হাজার শব্দ থাকতে এই ‘ইকরা’ বা পড়ো শব্দটি কেন সর্ব প্রথম উচ্চারিত হল তা নিয়ে একটু চিন্তা করলেই পাঠের গুরুত্ব সহজেই উপলব্ধি করা যায়। আর অভ্যাস মানে বারবার করা। কোন কিছু পূর্ণ আয়ত্বে আনতে বারবার করার বিকল্প নেই। তাই পাঠ আমাদেরকে নিত্য করতে হবে এবং তা আরো বাড়াতে হবে। অর্থাৎ আমাদেরকে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি করতে হবে।
আমরা মানুষÑসৃষ্টির শ্রেষ্ঠ-আশরাফুল মাখলুকাত। অন্য সব প্রাণী থেকে আমাদের মর্যাদা উচ্চ হওয়ার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে বিবেক বা ভালো জ্ঞান দিয়েছেন। এই বিবেকই আমাদের প্রতীক। আর আত্মিক অস্তিত্বই মানুষের আসল অস্তিত্ব। আমরা আমাদের দৈহিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কত সজাগ, কত ডাক্তারী উপদেশ নেই, কত পুষ্ঠিকর খাদ্য, কত ঔষধ খাই। কিন্তু আমাদের যে আসল অস্তিত্ব সেই আত্মার, সেই মনের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কমই চেষ্টা করি। বই পুস্তকের মধ্যে আছে আত্মার খোরাক। তাই বই পাঠের অভ্যাস আমাদের একান্ত প্রয়োজনীয়। মনের মধ্যে এই অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারলে পাঠের অভ্যাস আপনা আপনিই গড়ে উঠবে।
বই পড়তে হলে বই পেতে হবে। অনেকে বই পড়তে চাইলেও বই পায় না বলে পড়তে পারে না। এজন্য যত বেশী লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা যায় তত মঙ্গল। হাতের কাছে লাইব্রেরি পেলে সমাজের শিক্ষিত লোকদের বই পাঠের অভ্যাস বৃদ্ধি পাবে।
অনেক নীতিবান অভিভাবক মনে করেন লাইব্রেরিতে অনেক অশ্লীল অনৈতিক বই থাকে। কাজেই লাইব্রেরিতে গেলে আমাদের তরুণ তরুণীদের চরিত্র নষ্ট হবে। কাজেই লাইব্রেরি বর্জনীয়। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, পৃথিবীতে ভালো জিনিসের সাথে মন্দ জিনিসও মিশে থাকে। মাছের মাঝে কাঁটা থাকে, সুখের সাথে দু:খ থাকে। আমাদেরকে মাছ খেতে হলে কাঁটা বেছেই খেতে হবে, দু:খকে জয় করেই সুখ পেতে হবে। হাঁস যেমন ময়লা কাঁদার মধ্যে মুখ দিয়ে খারাপটি বেছে ফেলে দিয়ে ভালোটি খায় তেমনি আমাদেরকে লাইব্রেরির বই এর ভান্ডার থেকে ভালোগুলো বেছে নিয়ে সেগুলো পড়তে হবে। ভালো বই এর মধ্যে থাকে মনের সুস্বাস্থ্যের উপযোগী সব খাদ্য। ঐসব খাদ্যের স্বাদ এমন যে একবার এই স্বাদ পায় সে বারবার তা পেতে চায়। এতে তার পাঠের অভ্যাস বাড়বে। অন্যদিকে প্রবৃত্তির আপাত তৃপ্তিদায়ক উত্তেজনাকর খাদ্য যেমন নেশা ধরায় এবং দুস্পাচ্য হয় তেমনি প্রবৃত্তির উত্তেজক আপাত তৃপ্তিদায়ক কুরুচিপূর্ণ অনেক বই আছে যে গুলো অপরিণত বয়স্ক পাঠককে নেশাগ্রস্ত করে, তার চরিত্র ধ্বংস করে। পাঠাভ্যাসের মাধ্যমেই ও গুলো বর্জন করার ক্ষমতা জন্মাবে।
পাঠাভ্যাস বাড়ানোর জন্য আমরা কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। এক, আমরা পূর্বেই বলেছি যে দেহের খাদ্যের মত মনের খাদ্য বই এর দরকার। আমাদের প্রত্যেকের বাড়ীতে দেহের খাদ্য তৈরী করার জন্য রান্নাঘর থাকে। কিন্তু মনের খাদ্যের জন্য লাইব্রেরি থাকে না। আমাদের পরামর্শÑপ্রত্যেক গৃহস্থ যেন বাড়ী তৈরীর সময় রান্নাঘরের পাশাপাশি একটি লাইব্রেরি ঘরেরও ব্যবস্থা করেন। এটা করতে পারলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি পাবে।
দুই, বেশী বই পাঠের জন্য প্রত্যেক পরিবার, বিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক সংস্থা পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখতে পারেন। এতে শিশু, তরুণ-তরুণী সবাই বই পাঠে উৎসাহিত হবে। ফলে তাদের পাঠাভ্যাস বাড়বে।
তিন, বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিয়ে শাদী ইত্যাদিতে বই পুস্তক উপহার দেয়ার রেওয়াজ অধিক মাত্রায় চালু করতে হবে। এতেও পাঠাভ্যাস বাড়বে।
চার, বি.সি.এস সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বই পাঠের অভ্যাস যাচাই এর জন্য প্রশ্ন রাখতে হবে। বিয়ের পাত্রপাত্রী বাছাই এর সময়ও বই পাঠের বিষয়ে প্রশ্ন করতে হবে।
পাঁচ, আমাদের মনে রাখতে হবেÑঊীধসঢ়ষব রং চৎবপবঢ়ঃ.
আমাদের নিজেদেরকে উত্তম বই’র পাঠক হতে হবে। তবেই ছোটদের মধ্যে বই পাঠের আগ্রহ সৃষ্টি হবে। এতে তাদের পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি পাবে।
লেখক: প্রবীণ শিক্ষক ও চিন্তাবিদ।