বিশেষ প্রতিনিধি
প্রায় দেড়’শ বছরের পুরোনো আসাম প্যাটার্নের ঘরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। এই প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং সুনামগঞ্জের সংস্কৃতিসহ সকল ঐতিহ্য তুলে ধরতে ‘সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য যাদুঘর’র যাত্রা শুরু হয়েছে। উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন জেলা পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগে এমন যাদুঘর এটাই প্রথম। ৬ কক্ষ বিশিষ্ট এই যাদুঘর একসময় সুনামগঞ্জের হৃদয় হিসাবে গড়ে ওঠবে বলেও দাবি করা হয়েছে।
শহরের ডিএস রোডের পাশে প্রায় দেড়’শ বছর আগের এসডিও কোর্টের (পুরাতন কালেক্টরেট ভবন) এসডিও’র এজলাসই ছিল আসাম প্যাটার্নের ঘরের সবচেয়ে বিলাসবহুল ঘর। কাঠের পাটাতনের উপর নির্মিত এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে, এবং একই সঙ্গে এই ঘরের মূল প্যাটার্ন ঠিক রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ভেতরে আরো নান্দনিক করে সুনামগঞ্জের নানা ঐতিহ্য এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।
চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি এই ঐতিহ্য যাদুঘরের উদ্বোধন করেছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি এবং অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি। যাদুঘরটি’র প্রাথমিক পর্যায়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কক্ষ, মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, পরিবেশ ও প্রকৃতি এবং জীবন-জীবিকা তুলে ধরার জন্য আলাদা আলাদা নামে আলাদা আলাদা কক্ষ, অফিস কক্ষ এবং টিকেট কাউন্টার করা হয়।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কক্ষে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীতে আব্দুজ জহুর সেতু উদ্বোধনের ফলক, সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের ১১ সেতু উদ্বোধনের ফলক, গৌরীপুরের জমিদারের জমিদারী আমলের খাজনা রাখার ৩ সিন্দুক ও সুনামগঞ্জের লেখকদের নানা প্রকাশনাও স্থান পেয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে-সুনামগঞ্জের কক্ষে উজানীগাঁও বধ্যভূমি, টেকেরঘাট স্মৃতিসৌধ, রানীগঞ্জ স্মৃতিসৌধ, বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ, সতের শিখা বধ্যভূমি, মহেষখলা স্মৃতিসৌধ, টেংরাটিলা স্মৃতিসৌধ ও ডলুরা স্মৃতিসৌধের ছবি এবং ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক, এম এ হালিম বীরপ্রতীক, মো. আব্দুল মজিদ বীরপ্রতীক, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতিসহ মুক্তিযোদ্ধাগণের পোট্রেট স্থান পেয়েছে।
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি কক্ষে মরমীসাধক রাধারমণ দত্ত, মরমী কবি হাসনরাজা, বাউল স¤্রাট শাহ্ আব্দুল করিম, বাউল দুর্বিন শাহ্, বাউল কামাল পাশাসহ লোককবিদের পোট্রেটসহ তাঁদের গানের প্রকাশনা পুরোনো নানা বাদ্যযন্ত্রও স্থান পেয়েছে।
পরিবেশ ও প্রকৃতি কক্ষে- টাঙ্গুয়ার হাওরের নানা ছবি, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন বালু-পাথর মহাল, বিলুপ্ত প্রজাতির হাড়গুড়, রানী, তারা বাইম, মধু পাবদাসহ মিঠাপানির নানা জাতের মাছ এবং টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাণ-বৈচিত্রের ছবি রাখা হয়েছে।
জীবন-জীবিকা কক্ষে নৌকা, মই, জোয়াল, লাঙ্গল, শীতলপাটি, গুই, ইচারাই, রোঙ্গা, ওঁচু, খলুই, কুইচ্চা চাই, মোচনা চাই, পলো, বালিশ চাই, ঢেঁকিসহ সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষের ব্যবহারের নানা উপদান রাখা হয়েছে।
ঐতিহ্য যাদুঘর ঘুরে দেখার সময় সুনামগঞ্জের রাজনীতিক হায়দার চৌধুরী লিটন বলেন,‘নিজের ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্ব প্রজন্মের, ঐতিহ্য যাদুঘর’ সেটি বহন করছে, এই যাদুঘরটি আরো সমৃদ্ধ করতে হবে’।
রাজনীতিক সিরাজুর রহমান সিরাজ বলেন,‘স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সরকারিভাবে এই ধরনের স্থাপনার মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ’।
শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান মৌ বলেন,‘ঐতিহ্য যাদুঘর ঘুরে দেখলে সুনামগঞ্জ সম্পর্কে জানা যায়’।
শিক্ষার্থী অহনা সাওতি দিশা বলেন,‘সুনামগঞ্জে আসা পর্যটকরাও এখানে আসতে আগ্রহ দেখান, সেভাবেই এই প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলতে হবে’। একই মন্তব্য নাহাত হাসান পৌলমী’র।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘৬০ হাজার লোকগানে সমৃদ্ধ এই জেলা। চারজন বিখ্যাত লোককবির জন্মভূমি এটি। এই জেলায় এই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান জরুরি ছিল। এখানকার কৃতি সন্তান ড. মোহাম্মদ সাদিক এবং এই জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক ও পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আলী খানের চেষ্টায় কালেক্টরেটের কাঠের পাঠাতনের উপর করা পুরাতন ঐতিহ্যবাহি ঘরটিকে যাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। আমরা মনে করছি, এটি হবে সুনামগঞ্জের হৃৎপি-। হৃৎপি-ে মানুষের যেমন রক্ত সঞ্চালন হয়, এটিও সেই কাজ করবে। এখানকার সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য, দিবস উদযাপন সবকিছুই এই চত্বরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে। সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে এটি বাড়তি যোগ হয়েছে’। তিনি জানান, জাতীয় যাদুঘর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি এর একটি অভ্যন্তরীণ ডিজাইন তৈরি করেছেন, সেই অনুযায়ী এটি সাজানো হবে। জেলা পরিষদ প্রশাসক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন সামনে একটি মঞ্চ তৈরি করে দেওয়াসহ সামনের কাজ করে দিচ্ছেন, তাতে এখানকার নান্দনিকতা আরো বাড়বে।
সুনামগঞ্জের কৃতীসন্তান পিএসসি’র চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন,‘সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার জন্য এরকম একটি স্থান খুঁজছিলাম। যখন এই আদালত নতুন ভবনে স্থানান্তর হয়, এটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়, তখন আসাম প্যাটার্নের এই ঘরটি আমাদের আবেগকে নাড়া দিয়েছে। আমি জেলা প্রশাসককে একটি ডিও লিখি। এরপর থেকে ৪ জন জেলা প্রশাসক এর পেছনে কাজ করেছেন। পৌর মেয়র আয়ুব বখ্ত জগলুলসহ অনেকের সহযোগিতায় এবং সহকর্মীদের কষ্টের ফলে এখন এটি ‘সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য যাদুঘর’এ রূপ পেয়েছে। আমার ধারণা প্রশাসনসহ সকলের সমন্বিত উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ এটাই প্রথম। সুনামগঞ্জের প্রশাসন, সুশীল সমাজ, রাজনীতিক সবাই মিলে এটি করেছেন। এই প্রতিষ্ঠানটি-ই হবে ‘সুনামগঞ্জের হৃদয়’- বর্তমান বাংলাদেশ যে ঐতিহ্য-সংস্কৃতি লালন করে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। এই ঐতিহাসিক যাত্রায় সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য যাদুঘর প্রাণের সংযোজন’’। তিনি সকল পর্যায়ের নাগরিকদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ এই যাদুঘরে দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে সুন্দর করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।


