‘আল্লায় যেন শেখের বেটিরে বেশিদিন বাচাইয়া রাখইন’

বিশেষ প্রতিনিধি ও আমিনুল ইসলাম, মানিগাঁও-তাহিরপুর থেকে ফিরে
‘অসুস্থ্যতার লাগি আমার স্বামীর দুই পা কাটা অইছে। অচল স্বামীরে কান্দে (কাঁধে) লইয়া ভিক্ষা কইরা সংসার চালাইছি। মাইনষের হাতও পাও ধইরা এইবাড়ি, হইবাড়ি থাইক্কা বুড়া হইগেছি, চেয়ারম্যান-মেম্বাররে কতবার কইছি বয়স্কভাতার কার্ড পাইছি না, অখন শেখের বেটি পাকা ঘর দিছইন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পইড়া তার লাগি কইমু, আল্লায় যেন শেখের বেটিরে বেশিদিন বাছাইয়া রাখইন।’
তাহিরপুরে প্রকৃতির রূপ সৌন্দর্য্যরে মাঝখানে বালুচরে গড়ে তোলা ৭৬ টি ঘরের একটির সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের গুটিলা গ্রামের আলিম উদ্দিনের স্ত্রী শহরবানু (৬৫)।
তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী উত্তর বড়দল ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামের উত্তরে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের বিখ্যাত শিমুল বাগান, দক্ষিণে মানিগাঁও বাজার, পূর্বে পাহাড়ের বুক ছিড়ে নেমে আসা জাদুকাটা নদী এবং পশ্চিমে মানিগাঁও গ্রাম। যেন অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি এই অঞ্চল। ওখানেই গড়ে তোলা ৭৬ টি সেমি পাঁকা ঘর। টুকটাক রংয়ের কাজ ছাড়া নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ। রবিবারই ঘরগুলোর চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ৫৩ হাজার ৩৪০ টি ঘরের সঙ্গে এই ঘরগুলোও গৃহহীনদের হস্তান্তর করবেন।
শুক্রবার মানিগাঁওয়ের পাশে নির্মিত এই ৭৬ টি সেমি-পাকা ঘর দেখতে গিয়ে দরিদ্র-গৃহহীন মানুষের উচ্ছাস দেখা গেছে।
উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের গুটিলা গ্রামের রিক্সাচালক ৩ সন্তানের জনক বাচ্চু মিয়া বললেন, ‘২ ছেলে ১ মেয়ে নিয়ে সংসার, জায়গাজমি বাড়ি-ঘর কিছুই নাই, শেখ হাসিনার দয়ায় ঘর পাইছি, আল্লার কাছে দোয়া করি তাঁরে (শেখ হাসিনা) আরও সহযোগিতা করার শক্তি দেন আল্লা।’
একই ইউনিয়নের পৈলনপুর গ্রামের নিখিল শুক্লবৈদ্যের স্ত্রী রেনু শুক্লবৈদ্য বললেন, ‘বাড়ি ঘর নাই, বাচ্চার বাপে সামান্য জমিজমা কইরা কোন রকম সংসার চালায়, ঘর পাওনে মাথা গুজার ঠাই অইছে, ভগবান শেখ হাসিনার যেন ভালা করইন।’
মানিগাঁও গ্রামের চান মিয়ার স্ত্রী আলেকজান বিবি বললেন, ‘জীবনভরা কষ্ট করছি, মাইনষের বাড়িত থাকছি, অখন যেখানো আছি তারা ৬ মাসের লাগি যেগা দিছিল, এর মাঝে ঘর পাইছি, আমরার লাগি আসমান পাওয়ার সমান।’
শহরবানু, বাচ্চু মিয়া, রেনু ও আলেকজান কেবল নয়, মানিগাঁওয়ে ঘর পাওয়া ৭৬ পরিবারেই জীবনের গল্প প্রায় একই রকমের।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বললেন, প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের অপরূপ লীলাভূমিতে এই গ্রাম গড়ে তোলা হয়েছে। এখানকার বসতির নিরীহ দরিদ্রদের খেয়ে বেঁচে থাকার কষ্টও করতে হবে না। পাশে শিমূল বাগান একসময় পর্যটক নির্ভর কাজ করে জীবিকা হবে এখানকার অনেকের। আবার পাহাড়ী নদীতে বালু পাথরের কাজসহ নানা কাজের সংস্থানও আছে এখানে। একসঙ্গে ৭৬ পরিবার মিলে মিশে বসবাস করলে পুরোনো মানিগাঁওয়ের গ্রামের চেয়েও দৃষ্টিনন্দন গ্রাম হবে এটি। বিদ্যুৎ, পানির জন্য টিউবওয়েল সব ব্যবস্থাই হয়ে গেছে। এখান থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সহজ। অনেকটা পাহাড়ী এই জনবসতিতে দরিদ্র এই পরিবারগুলো শত শত বছর হয়তো থাকবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার বদান্যতায়।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম বললেন, মানিগাঁওয়ের নতুন বসতিতে এসে প্রাণ জুড়িয়ে গেছে। দরিদ্র গৃহহীন মানুষের হাঁসি প্রকৃতির রূপ সৌন্দর্য্যকে যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বললেন, আগামী রোববার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ৭৬ ঘরসহ জেলায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০৯ টি ভিটেমাটিহীন গৃহহীনের সেমি-পাকা ঘরের চাবি প্রদান অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন। এর আগে এই জেলায় প্রথম পর্যায়ে আরও ৩৭৭১ টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর দেওয়া হয়েছে।