বিশেষ প্রতিনিধি
শাল্লায় হিন্দু ধর্মাবলম্বি অধ্যুষিত গ্রামে হামলা, লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামী শহিদুল ইসলাম স্বাধীন মিয়া জামিন পেয়েছেন। কিন্তু নোয়াগাঁও গ্রামের তরুণ ঝুমুন দাস এখনো জামিন পান নি। ঝুমন দাসের অপরাধ কেবল বিতর্কিত মাওলানা মামুনুল হককে কটাক্ষ করে স্ট্যাটাস দেওয়া। আলোচিত এই ঘটনার প্রধান আসামীর জামিন পাবার বিষয়টি মঙ্গলবার সুনামগঞ্জে ছিল আলোচনার বিষয়। বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, হামলা, লুটপাট, দেবালয় ভাংচুরের মামলাটি দুর্বল হওয়ায় আসামীরা জামিন পেয়েছে, দু:খজনক হলো একজন বিতর্কিত মাওলানার বিরুদ্ধে ফেসবুকে মন্তব্য করে এক নিরীহ তরুণ এখনো জেলের ঘানি টানছে। ঝুমনের বিষয়টিও মানবিকভাবে দেখার আবেদন জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
সোমবার সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ মো. ওয়াহিদুজ্জামান শিকদার শহীদুল ইসলাম স্বাধীনের জামিন প্রদানের আদেশ দেন।
গত ১৯ মার্চ ইউপি সদস্য যুবলীগ কর্মী শহিদুল ইসলাম স্বাধীন মিয়াকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরদিন স্বাধীন মিয়াকে শাল্লা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পুলিশ আদালতে হাজির করে স্বাধীনের ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে। ২৩ মার্চ আদালত তার ৫ দিনের রিমা- মঞ্জুর করেন। রিমা-ে পুলিশের কাছে নোয়াগাঁওয়ের হামলায় নিজের যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন নি স্বাধীন। কিন্তু হামলার সময় বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে তার ছবি দেখা গেছে। সোমবার আদালতে জামিন চাওয়ার সময় কারাগারেই ছিলেন স্বাধীন মিয়া। শুনানী শেষে তাকে জামিন প্রদানের আদেশ দেন জেলা ও দায়রাজজ মো. ওয়াহিদুজ্জামান শিকদার।
জাতিরজনক শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের সমর্থকরা গত ১৭ মার্চ হামলা, লুটপাট ও ভাংচুর করে নোয়াগাঁও গ্রামের ৮৮ বাড়িতে। এসময় গ্রামের ৫ টি মন্দির ভাংচুর করা হয়। নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মাওলানা মামনুল হককে কটাক্ষ করে কথিত স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় এই তা-ব চালানো হয়। এ ঘটনায় গ্রামবাসীর পক্ষে পরদিন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় ৫০ জনের নামোল্লেখ করে ১৫০০ জন আসামী, শাল্লা থানা পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর আব্দুল করিম বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাত ১৫০০ জন আসামী এবং ঝুমন দাসের মা নিভা রানী দাসের আদালতে দায়ের করা মামলায় ৭০ জনের নামোল্লেখ করে ১৫০০ জনকে আসামী করা হয়। সকল মামলায় প্রধান আসামী ছিলেন স্বাধীন মিয়া। গ্রামে ভাংচুর-হামলার মামলায় এই পর্যন্ত ১০৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরমধ্যে বেশিরভাগ আসামীই জামিন পেয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামীর মধ্যে ১৮ জন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এরা সকলেই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
সুনামগঞ্জ ডিবির ওসি ইকবাল বাহার জানান, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়া ১৮ জনই ভাংচুর লুটপাটে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। শহীদুল ইসলাম স্বাধীন মিয়াও যে হামলায় ছিল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেবার সময় অনেকেই বলেছে। কিন্তু স্বাধীন নিজের জবানবন্দিতে তার জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
সোমবার স্বাধীন মিয়া আদালতের আদেশে জামিন লাভ করলে এই ঘটনা আবারও আলোচনায় আসে। আইনজীবীরা বলেছেন, তদন্তকারী সংস্থা মামলায় এমন ধারা যুক্ত করে দেওয়া জরুরি ছিল, বিচার না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীন মিয়া যাতে কারাগারেই থাকে।
সুনামগঞ্জ জেলা গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট রুহুল তুহিন বললেন, নোয়াগাঁওয়ের তা-বের ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত। এই ঘটনার প্রধান আসামী জামিন পাওয়ায় সবার সামনে আবারও আলোচনায় এসেছে ঘটনাটি। তিনি, গ্রামের তরুণ ঝুমুন দাসের মুক্তি দাবি করে বলেন, ঝুমন ফেসবুকে বিতর্কিত মামুনুল হককে নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও কোন মন্তব্য করেন নি। একই ধরণের মন্তব্য করেন, জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ।
ঝুমনের জেঠাতো (চাচাতে) ভাই পুলিশের অব. সাব ইন্সপেক্টর বীর মুক্তিযোদ্ধা জগদিশ দাস মামলায় যুক্ত করা আইনের দুর্বলতায় স্বাধীন মিয়ার মতো অপরাধী জামিন পেয়েছে মন্তব্য করে বলেন, মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ ছিল না। মন্দির ভাংচুর করা হয়েছে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কে ভাংচুর করলো উল্লেখ নেই। গ্রামবাসী ঘটনায় দায়ী ৭২ জন অপরাধীকে চিহিৃত করেছিল। কিন্তু পরে দেখা গেলো মামলায় আসামী হিসেবে ৫০ জনের নামোল্লেখ আছে। এই অবস্থায় ঝুমনের মা নিভা রানী দাস বাদী হয়ে ৭২ জনের নামোল্লেখ করে মামলা করতে শাল্লায় থানায় যান। পুলিশ মামলা নেয় নি। বাধ্য হয়ে আদালতে যান নিভা রানী দাস। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে নিয়মিত মামলা গ্রহণের জন্য থানাকে নির্দেশ দেন নি। এজন্য এই মামলাও এখনো তদন্তাধীন আছে। অর্থাৎ এখনো এই মামলায় কোন সুফল পাওয়া যায় নি।
ঝুমুনের ভাই নুপুর চন্দ্র দাস বললেন, ঝুমন মামুনুল হকের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়েছে কি-না, এই নিয়ে এখনো আমরা সন্ধিহান। আমরা মনে করি তার ফেসবুক হ্যাকও হতে পারে। গতকাল সোমবারও আমি তার ফেসবুক সচল দেখেছি। ম্যাসেজ দিয়েছি, জবাব পাই নি। তিনি জানালেন, নি¤œ আদালতে ঝুমুনের জামিন না হওয়ায় গত ২৫ মে সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ঝুমুন দাসের জামিন শুনানী করা হয়। সেখানেও তার জামিন না হওয়ায় সোমবার (২১ জুন) উচ্চ আদালতে তার জামিনের আবেদন করেছেন তারা। আদালত জামিন শুনানীর তারিখ পরে জানাবেন বলে জানিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম বললেন, নোয়াগাঁওয়ের ঘটনায় গ্রামবাসীর পক্ষে বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল এবং পুলিশের দায়ের করা দুটো মামলাই দুর্বল হয়েছে। এই সুযোগ নিয়েছে আসামীপক্ষ। ঝুমন দাসের মামলা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। নি¤œ আদালত এসব মামলায় জামিন দিতে চান না।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান সেলিম বলেন, ঘটনাটি যতবড় ছিল, মামলা ততটুকু দুর্বল ছিল। এ কারণে আসামীরা জামিন পেয়েছে।
মুক্তিসংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্ট’ সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সালেহ আহমদ বললেন, ঘটনার পর দায়ের করা দুটি মামলায় সংযুক্ত ধারাই আসামীকে জামিন পেতে সহযোগিতা করেছে।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ্ শহীদুল ইসলাম শাহীন এই মামলায় স্বাধীন মিয়ার জামিন হওয়া প্রসঙ্গে বললেন, মামলাটির শুরুতেই আমরা বলেছিলাম, দ্রুত বিচার আইনে মামলা গ্রহণের জন্য। সেটি হয় নি। এই মামলার এজাহারে বলা হয়েছে লুটপাট এবং দেবালয় ভাংচুর হয়েছে। তাহলে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে দ-বিধির ৭১১ ধারা যুক্ত হতে পারতো। তার মতে তদন্তকারী সংস্থা মামলায় সম্পুরক অভিযোগপত্র দিতে পারতেন এবং বিচার নিস্পত্তি হবার পূর্ব পর্যন্ত যাতে আসামী কারাগারে থাকে সেভাবেই ধারা সংযুক্ত করে দিতে পারতেন। তিনি বলেন, ঝুমনের মামলা ডিজিটাল নিরাপত্ত আইনে দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় জামিনের ক্ষেত্রে আদালত রক্ষণশীল থাকেন।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বললেন, নোয়াগাঁওয়ের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় দেওয়া দ-বিধির ধারাগুলোর সঙ্গে আরও কিছু ধারা সুপারিশের ভিত্তিতে সংযোজন করা হয়েছিল। এই মামলায় ১৪-১৫শ’ আসামী দেওয়া হয়েছে। ঘটনার চাক্ষুস কোন স্বাক্ষিও ছিলো না। যে কজন ছিলেন, তারা আসামীদের চিনেন না। দ্রুত বিচার আইনে মামলা নেবার ক্ষেত্রে কিছু বাধ্য বাধকতা আছে, হাতে-নাতে ধরে ৭ দিনের মধ্যে চার্জশীট দিতে হয়। হাতে নাতে না ধরলে পরবর্তী ৭ দিনের মধ্যে চার্জশীট দিতে হবে। এই ঘটনায় এই আইনে মামলা গ্রহণ বাস্তব সম্মত ছিল না। মামলায় দেবালয় ভাংচুরের ঘটনার ধারা সংযুক্ত রয়েছে। আসামী পক্ষকে সহযোগিতা করার মোটিভ নিয়ে পুলিশ মামলা গ্রহণ করে নি। বাস্তবতার ভিত্তিতে মামলায় ধারা সংযোজন হয়েছে।


