উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নিলেন শিক্ষক

বিশেষ প্রতিনিধি
বিদ্যালয়ের প্রায় আড়াই’শ শিক্ষার্থীর বেশিরভাগেরই উপবৃত্তির টাকা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পিনকোড সংগ্রহ করে হাতিয়ে নেন প্রধান শিক্ষক। বিষয়টি টের পেয়ে শতাধিক অভিভাবক প্রধান শিক্ষকের উপর চড়াও হন। পরে স্থানীয় গণ্যমান্যদের হস্তক্ষেপে শিক্ষক টাকা ফেরৎ দিচ্ছেন। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার হকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা সরেজমিনে তদন্তের জন্য রোববার জেলা উপবৃত্তি মনিটরিং কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। একই সঙ্গে দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে আগামীকাল সোমবার ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্তপূর্বক রিপোর্ট দেবার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার হকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষক আছেন ৭ জন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তোফায়েল আহমদ। করোনাকালে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে না আসলেও তাদের উপবৃত্তির টাকা নগদ অ্যাপের মাধ্যমে নিজ নিজ মোবাইলে গেছে। প্রধান শিক্ষক তোফায়েল আহমদ বিদ্যালয় পাশর্^বর্তী গ্রামে গ্রামে গিয়ে গত কয়েক দিনে শিক্ষার্থীদের নগদের হিসাবের পিন নম্বর সংগ্রহ করে টাকা হাতিয়ে নেন। বিষয়টি অভিভাবকরা টের পেয়ে গত ২০ জুন প্রধান শিক্ষকের উপর চড়াও হন। অভিভাবকদের চাপে প্রধান শিক্ষক বিষয়টি স্বীকার করেন। শেষে স্থানীয় গণমান্যরা টাকা ফেরৎ দেবার শর্তে আপোসে বিষয়টি নিস্পত্তি করেন। শনিবার রাতে প্রধান শিক্ষক নিজে এবং তার নৈশ প্রহরি দিয়ে টাকা ফেরৎ দেবার কাজ শুরু করেছেন। প্রধান শিক্ষকের এমন গর্হিত অপরাধের বিষয়টি শনিবার দোয়ারাবাজার উপজেলায় ছিল আলোচনার বিষয়।
হকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিভাবক কালা মিয়া বললেন, আমার চার সন্তান বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। ২০১৮-১৯’এর পর আমার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানরা উপবৃত্তির কোন টাকা পায় নি। পরে জানলাম প্রধান শিক্ষক বাড়ি বাড়ি এসে নগদের অ্যাকাউন্টের পিনকোড নিয়ে টাকা হাতিয়েছেন।
এলাকার শিক্ষার্থী অভিভাবক জমশেদ মিয়া জানালেন, বিদ্যালয়ের অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, বাড়ি বাড়ি এসে প্রধান শিক্ষক পিনকোড জেনে উপবৃত্তির ৯০০ টাকা তুলে ৪৫০ টাকা দিয়ে গেছেন। অভিভাবকরা এ নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও চেয়ারম্যানসহ গণমান্যদের কাছে নালিশ করেছেন।
এই বিষয়ে জানার জন্য রোববার সকাল থেকে কয়েক দফায় প্রধান শিক্ষক তোফায়েল আহমেদের মুঠোফোনে ফোন দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী ই¯্রাফিল হোসেনের মুঠোফোনে ফোন দিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবার অনুরোধ জানালে, ই¯্রাফিল জানান, প্রধান শিক্ষকের ফোনে তিনিও ঢুকতে পারছেন না।
উপবৃত্তির টাকার বিষয়ে নৈশ প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক তাকে ৩৬ জনের টাকা দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফেরৎ দেবার কথা বলেছেন, এজন্য তিনি ৩৬ জনকে ৪৫০ টাকা করে এবং ৪ জনকে ৯০০ টাকা করে ফেরৎ দিয়ে এসেছেন।
শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা তুলে আনার বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না জানিয়ে এই নৈশপ্রহরী বললেন, অভিভাবকরা স্কুলে এসে হট্টগোল করায় তাদের বিষয়টি জানা হয়েছে। পরে প্রধান শিক্ষক তাকে বলেছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা ফেরৎ দিতে, এজন্য প্রধান শিক্ষকের আদেশ পালন করছেন তিনি।
স্থানীয় বাংলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন জানালেন, হকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তোফায়েল আহমদ পিন নম্বর সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা নিয়ে গেছেন বলে কিছু অভিভাবক তাঁকে জানিয়েছেন। ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা পরে প্রধান শিক্ষকের ওপর চড়াও হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যসহ অন্যান্য গণ্যমান্যদের হস্তক্ষেপে প্রধান শিক্ষক টাকা ফেরৎ দেবার শর্তে বিষয়টির মিমাংসা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে তাঁকে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা এসএম আব্দুর রহমান বললেন, রোববার এই বিষয়টি আমি জেনেছি। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন কুমার সানাও আমাকে বলেছেন, হকনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কিছু শিক্ষার্থীর পিনকোড নিয়ে টাকা তুলেছেন। এই নিয়ে হট্টগোলও হয়েছে। আমি রোববারই এই বিষয়ে দুটি পক্ষকে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছি। উপবৃত্তির মনিটরিং অফিসার দেলোয়ার হোসেনকে সরেজমিনে গিয়ে এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন কুমার সানাকেও আগামীকাল সোমবার সরেজমিনে ওখানে গিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবার জন্য বলেছি।
তিনি বললেন, আমরা শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেই, তারা যাতে নগদের অ্যাকাউন্টের পিননম্বর কাউকে না দেয়। অথচ. একজন শিক্ষকই এই কাজ করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। আমরা তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।