সু.খবর ডেস্ক
এমন একটা মুহূর্তের জন্য ১৬ বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলেন লিওনেল মেসি! ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেকের পর থেকে আজকের আগে চারটি বিশ্বকাপ গেছে, পাঁচটি কোপা আমেরিকা গেছে। প্রতিবারই মেসি টুর্নামেন্টে নেমেছিলেন আকাশি-সাদা জার্সিটা গায়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন বুকে নিয়ে। প্রতিবারই ফিরেছেন ভাঙা হৃদয় নিয়ে, স্বপ্ন ভাঙার বেদনাকে সঙ্গী করে। আজকের দিনটা ছিল অন্যরকমই। অন্তত আজেন্টিনার অন্য ফাইনালের দিনগুলো যেভাবে শেষ হয়, তেমন অবশ্যই নয়।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি এর আগেও ফাইনালে খেলেছেন। এক-দুটি নয়, চারটি। চারবারই হেরেছিলেন। অবশেষে দশম টুর্নামেন্টের পঞ্চম ফাইনালে প্রথম শিরোপার দেখা পেলেন, ঘুচল তাঁর ক্যারিয়ারের একমাত্র অপ্রাপ্তি! সেটিও ঘুচল, স্বপ্নের মতো করেই। ব্রাজিলের মাটিতে ব্রাজিলকে হারিয়ে ফাইনাল জেতার অনুভূতি তো আর্জেন্টাইনদের জন্য স্বপ্নের মতোই।
অনেক দিনের অপেক্ষারই অবসান। সময়ের হিসেবে ২৮ বছর। এত দিনের এ অপেক্ষার শেষটা যে এত মধুর হবে সেটি মেসি হয়তো ভাবেননি। সে কারণেই কি না, শিরোপা হাতে নিয়ে অবিশ্বাস মেশানো আনন্দে মেসির কৃতজ্ঞতা ঝরল সৃষ্টিকর্তার প্রতি।
মেসির মনে হচ্ছে, তিনি যে একগুলো ফাইনালে হেরেছেন, সেটি হয়তো বিধাতারই নির্ধারিত বিধি, হয়তো এমন একটা মুহূর্তের জন্যই এত বেদনা, এত স্বপ্ন ভঙ্গ, ‘আমার মনে হয় ঈশ্বর এমন একটা মুহূর্ত আমার জন্যই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনাল জেতা, তা-ও তাদেরই দেশে!’
সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরপরই মেসির শ্রদ্ধা কোচ স্কালোনির প্রতি, ‘‘লিওনেল তাঁর দারুণ প্রতিভা বুঝিয়ে দিয়েছেন। জাতীয় দলের জন্য সব সময় সেরাটাই চেয়েছেন তিনি। জানতেন কীভাবে একটা শিরোপা জেতার মতো দল গড়তে হয়। সবার প্রশংসা তাঁর প্রাপ্য।’
আর্জেন্টিনা দলে কখনোই প্রতিভার অভাব ছিল না। ২০১৪ থেকে ২০১৬Í তিন বছরে টানা তিন ফাইনালে মেসির বেদনার সঙ্গী ছিলেন হিগুয়েইন, দি মারিয়া, মাচেরানো, আগুয়েরোর মতো তারকারা। কিন্তু সে দলের আক্রমণভাগ তারকায় ঠাসা হলেও রক্ষণ ছিল নড়বড়ে। এর আগে ২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনালে রিকেলমে-আয়ালাদের সঙ্গে পেলেও দুঙ্গার ব্রাজিলের অতি-রক্ষণাত্মক ফুটবলে বন্দী হয়ে ছিলেন মেসিরা।
এবারের দলটা সে তুলনায় ব্যতিক্রম। দি পল, লো সেলসো, পারেদেস, লওতারো, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, রোমেরোদের কেউ বড় তারকা নন, কিন্তু দলের জন্য জানবাজি রেখে খেলেছেন। স্কালোনির নির্দেশের বাস্তবায়নে রক্ষণ জমাট রেখে খেলার কৌশলেও মানিয়ে নিয়েছেন।
দলের প্রতিও তাই মুগ্ধতা মেসির, ‘এই দলের ওপর আমার ভরসার কখনো কমতি ছিল না। সর্বশেষ কোপা আমেরিকার (২০১৯) পর থেকে দলটা আরও শক্তিশালী হয়েছে। দারুণ কিছু মানুষকে নিয়ে গড়া আমাদের দলটা, যারা সব সময়ই সব বাধা ঠেলে সামনে এগোতে চায়, কখনো কিছু নিয়ে অভিযোগ করে না।’
করোনার এ সময় জৈব সুরক্ষা বলয়ে থাকাটাও ছিল বড় ত্যাগ। খেলোয়াড়েরা এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেননি। মুখ বুঝে সহ্য করে গেছেন পরিবার-বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বিচ্ছেদের ধকল। গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ যেমন সন্তান জন্মের সময়টাতেই স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেননি।
মেসি মনে করেছেন সে দিনগুলোর কথা, ‘কত দিন ধরে বলয়ের ভেতরে আছি আমরা। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য সব সময় পরিষ্কার ছিল, শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি। এই খুশিটার কোনো তুলনা হয় না। এমন কিছুর স্বপ্ন কতশতবার যে দেখেছি!’
মেসির নিজের ১৬ বছরের অপেক্ষা তো বটেই, এই শিরোপা আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের শিরোপার অপেক্ষাও ঘুচিয়েছে। এই শিরোপার গুরুত্ব তাই মেসির কাছে অন্যরকম, ‘আমরা হয়তো এখনো বুঝে উঠতে পারিনি যে আমরা আসলেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, আমরা কী অর্জন করেছি। তবে আমার মনে হয় এই ম্যাচটা ইতিহাসে সাক্ষী হয়ে থাকবে, শুধু আমরা দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি বলেই নয়, ব্রাজিলকে তাদেরই দেশে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি বলেও।’
ফাইনালের আগেই অবশ্য আর্জেন্টাইনদের ভালোবাসা বেশ ভালোভাবে টের পেয়েছেন মেসি। জন্মস্থান রোজারিওতে একটা উঁচু স্মৃতিস্তম্ভকে কাল আলোকিত করে রাখা হয়েছিল মেসির আর্জেন্টিনার জার্সি পরা ছবিতে। ফাইনাল শেষে আজ সেই ভক্তদেরও ভালোবাসা ফিরিয়ে দিলেন মেসি, ‘সবাই যে সবখানে উদ্যাপনে করছেন, সেটা শুনেছি। রোজারিওর মানুষ স্মৃতিস্তম্ভে আমাকে যে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সেটার জন্য তাঁদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।‘
ধন্যবাদ হয়তো মেসি আর তাঁর দলকেও দিচ্ছেন আর্জেন্টাইনরা! ২৮ বছরের যন্ত্রণার যে অবসান হলো তাঁদের!
সূত্র : প্রথমআলো
‘


