বিশেষ প্রতিনিধি
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে একেবারে দিশেহারা সুনামগঞ্জের সাধারণ মানুষ। সকলেই খুঁজছেন ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর পণ্যের গাড়ি। চাহিদার তুলনায় টিসিবির মালামাল একেবারেই কম। এজন্য ওখানেও ভোগান্তি রয়েছে। শত শত মানুষের লাইন, আছে স্বজনপ্রীতিও। টিসিবির পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর দাবি স্থানীয়দের।
সুনামগঞ্জের বাজারে রোববার সোয়াবিন প্রতি লিটার প্রকার ভেদে ১৫৫ থেকে ১৬০, মুসুরি ডাল প্রতি কেজি ৯০ থেকে ৯৫, পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ এবং চিনি ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রয় হয়েছে। অথচ. টিসিবির অপেক্ষাকৃত ভালো মানের সোয়াবিন তেল ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ১১০, চিনি প্রতি কেজি ৫৫, ডাল ৬০ এবং পেঁয়াজ ৩০ টাকা বিক্রয়ের নির্দেশনা রয়েছে। টিসিবি’র পণ্যের মূল্য সহনশীল পর্যায়ে হলেও সরবরাহ কম থাকায় এই পণ্যও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
টিসিবির পণ্যের ট্রাক আসলে পরিচিত বা প্রভাবশালী কোন ভোক্তা লাইনে দাঁড়ালে তাকে নিয়মের বাইরেও পণ্য দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের জন্যই সকল নিয়ম কানুন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক ভোক্তাকে খালি হাতে ফেরৎ যেতে হয়। কোথায় কোথায় টিসিবির পণ্য বিক্রয় হচ্ছে, অনেক সময় খুঁজেও পাওয়া যায় না।
সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়ার বাসিন্দা হোসেন আহমদ বললেন, কয়েকদিন আগে কালেক্টরেটের সামনের সড়কে টিসিবির পণ্য আনতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, আমার সামনেই কয়েকজন ক্রেতা একটার স্থলে দুইটা তিন টা সোয়াবিন নিয়েছেন, পরে আমাকে বলা হলো সোয়াবিন নেই। প্রায় সময়ই দেখা যায় প্রভাবশালী বা ডিলারের পরিচিতজনরা নিয়মের বাইরে মালামাল নিচ্ছেন, আমরা পাচ্ছি না।
শহরের উকিলপাড়ার বাসিন্দা মিজানুর রহমান সুমন বললেন, টিসিবির পণ্য ডিলাররা কোথায় বিক্রি করেন, সাধারণ মানুষ জানতেও পারে না, কিনতে পায় না।
দোয়ারাবাজারের টিসিবি ডিলার বিনয় ট্রেডার্সের মালিক বিনয় চক্রবর্তী বললেন, ৬ মাস আগেও মালামাল তুলে সুনামগঞ্জ শহরে বিক্রয় করার নির্দেশ দেওয়া হতো আমাদের। এখন শহরে ডিলার হওয়ায় আমরা দোয়ারাবাজারেই বিক্রয় করি। গেল মাসে একবার ১৫ শ’ কেজি মালামাল পেয়েছি। এরমধ্যে ছিল সোয়াবিন ৪০০ লিটার, চিনি ৪০০ কেজি, ডাল ৪০০ কেজি এবং পেঁয়াজ ৩০০ কেজি তুলেছিলাম। এই মাল শেরপুর থেকে নিয়ে আসতে ৫৫০০ টাকা ট্রাক ভাড়া, পলিথিন ও লেবার খরচ দিয়ে বিক্রয় করে আমার হাজার দেড়েক টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এরপর আর মালামাল দেওয়া হয় নি।
সিলেট বিভাগের চার জেলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাসহ ৫ জেলার টিসিবির আঞ্চলিক অফিস মৌলভীবাজারের শেরপুরে। ওখান থেকে রোববার সকালে চিনি, ডাল, সোয়াবিন ও পেঁয়াজ মিলে ১৫০০ কেজি মালামাল তুলেছে সদর উপজেলার শ্রীমতি বাজারের লেইছ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। টিসিবি অফিস থেকে দেওয়া লেইছ এন্টারপ্রাইজের মুঠোফোন নম্বরে (০১৭২৭৬০২২১২) সকাল থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ না করায় তারা কোথায় পণ্য বিক্রয় করছেন জানা যায় নি।
টিসিবি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সুনামগঞ্জ সদরে মালামাল দেওয়া হবে নৃপতি রায় নামের ডিলারকে, মঙ্গলবার দেওয়া হবে দিরাই সড়ক মোড়ের মেহেদী এন্টারপ্রাইজকে, বুধবার দেওয়া হবে শহরের তেঘরিয়ার সরকারি পুকুর পাড়ের ইসলাম এন্টারপ্রাইজকে, বৃহস্পতিবার পাবে সদর উপজেলার কাঠইর বাজারের এমকে এন্টার প্রাইজ এবং শনিবার দেওয়া হবে সুনামগঞ্জ শহরের হাজীপাড়ার আহমেদ স্টোরকে। এভাবে পর্যায়ক্রমে প্রতিদিনই সদর উপজেলায় একজন ডিলার এবং সদর উপজেলার বাইরে যে কোন একটি উপজেলায় একজন ডিলার পণ্য পাবেন।
টিসিবির শেরপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক অফিস প্রধান ইসমাইল হোসেন বললেন, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে রোববার থেকে সিলেট বিভাগে প্রতিদিন ১২ জন ডিলারকে পণ্য দেওয়া হচ্ছে। সুনামগঞ্জে রোববার দেওয়া হয়েছে সুনামগঞ্জ সদরের লেইছ এন্টারপ্রাইজকে, এভাবে প্রতিদিন একজন ডিলারকে সদরের জন্য এবং আরেক ডিলারকে দেওয়া হবে সদর উপজেলার বাইরে বিক্রয়ের জন্য। জেলার নতুন ৩ জন ডিলারসহ ২৮ জন ডিলারকে পর্যায়ক্রমে এই মাসে পণ্য দেওয়া হবে। তিনি জানান, পণ্য সরবরাহ কম করলেও প্রতিদিন পণ্য দেওয়া হচ্ছে। যে সব ডিলার লাভ লোকসানের হিসাব করছেন, তারা লাভ করার সময় কাউকে বলেন না, এখন একটু কম লাভ হচ্ছে, তারা মালামাল নিতে উৎসাহিত হচ্ছেন না, যখন লাভ বেশি হয় তখন এসে ভিড় করেন। পণ্য ঠিকঠাক ভাবে বিক্রয় হচ্ছে কি না এটি স্থানীয় প্রশাসন দেখভাল করবেন এবং অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।


