আশা ও হতাশার ৭ ঘটনা

স্টাফ রিপোর্টার
বিদায় নিচ্ছে ২০২১। আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন আরেকটি বছর, ২০২২। পুরোনো বছরের সব ব্যর্থতা পেছনে ফেলে নতুন উদ্যমে শুরু হবে বছর- এ প্রত্যাশা সবার। তাই সবাই এখন ব্যস্ত নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এবং বিদায়ী বছরের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব করতে। ২০২১ সালে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে, যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। আবার এমন অনেক ঘটনা ছিল, যা আমাদের প্রাপ্তির খাতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ছাতক-সুনামগঞ্জ রেলপথ নিয়ে দ্বন্দ্ব, সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ককে ৪ লেনে উন্নীত করার দাবি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষক সংকট, বজ্রপাত ও পানিতে ডুবে মৃত্যু, বিদ্যুৎ ভোগান্তি, হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার ও নার্স সহ জনবল শূন্যতায় স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে অনিয়ম, কয়েক দফা পরিবহন ধর্মঘট, দোয়ারায় বিটিসিএল’র সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন, জগন্নাথপুর টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট বাস্তবায়নের খবরসহ আরও কিছু ঘটনায় সরগরম ছিল বছর। আলোচিত ৭ ঘটনা নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন।
নির্মাণকালেই ভাঙলো সেতু
২৮ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের পাগলা-জগন্নাথপুর-আউশকান্দি সড়কে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন কুন্দানালা সেতুর ৫ টি গার্ডারই ভেঙে যায়। সড়কের ছাতক অংশের কুন্দানালা খালের উপর প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতু নির্মাণ করা হচ্ছিল। স্থানীয়রা দাবি করছেন, কাজে অনিয়ম হওয়ায় এই সেতুর গার্ডার ভেঙেছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের দাবি কাজে অনিয়ম নয়, মেকানিকেল ত্রুটির কারণে হাইড্রোলিক পাইপ ফেটে যাওয়ায় ওজন নিতে পারে নি পাইপ, এই কারণে একটার উপর আরেকটা গার্ডার পড়ে সব কয়টি গার্ডারই ভেঙেছে। একই দাবি করে সওজ প্রকৌশলীরা বলেছেন, এর দায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে।
গ্রামজুড়ে ভাংচুর, লুটপাট
শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের সমর্থকরা হামলা, লুটপাট ও ভাংচুর করে ১৭ মার্চ। এসময় গ্রামের ৫টি মন্দিরসহ প্রায় এক’শ বাড়িঘরে তা-ব চালায় হামলাকারীরা। নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মাওলানা মামনুল হককে কটাক্ষ করে কথিত স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় সকাল ৮ টা থেকে ১০ টার মধ্যে এই তা-ব চালানো হয়। আগের দিন থেকেই নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দারা শুনছিলেন তাদের গ্রামে হামলা হতে পারে। বিষয়টি রাতেই স্থানীয় পুলিশকে জানান গ্রামবাসী। সকাল ৮ টায় দিরাই উপজেলার নাচনি, চন্ডিপুর, সন্তোষপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের কয়েক’শ মানুষ দা, রামদা, লাঠি-সোটাসহ দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে ওই গ্রামে হামলা চালায়। এসময় গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে থাকা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এবং গ্রামের চ-ি মন্দির, দুর্গা মন্দির, কালী মন্দির, শিব মন্দির, বিষ্ণু মন্দিরের পুরোহিতরাও গ্রাম ছেড়ে হাওরের দিকে চলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শী বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎ চন্দ্র দাশ (৭০) ও তার ছেলে লিটন দাশও ঘরের দরজা বন্ধ করে অবস্থান করছিলেন। লিটন দাশ জানান, আগের দিন সন্ধ্যায় আমার বড় ভাই জানালেন কাশিপুর, চণ্ডিপুর ও নাচনী গ্রামে মাইকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। এই অবস্থায় গ্রামের ঘরে ঘরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাত ৮ টায় হবিবপুর- নোয়াগাঁওয়ের গণমান্যরা বৈঠকে বসেন কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দানকারী ঝুমন দাশ আপনকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। এরপর প্রত্যেকটি সম্ভাব্য স্থানে দ্রুত মোটর সাইকেলে ঝুমনকে আটকের জন্য মানুষ পাঠানো হয়। রাতে উপজেলার শ্বাসখাই বাজার থেকে ঝুমনকে গ্রামের লোকজনই আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এরপর গ্রামের গণ্যমান্যরা জড়ো হয়ে পুলিশ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে ফোন করেন। তারা সকলেই আশ্বাস দেন, এখন আর কিছু হবে না। সকাল ৭ টা থেকে দিরাইয়ের বৃহৎ গ্রাম নাচনি, চণ্ডিপুর ও শাল্লার কাশিপুরের মসজিদে মসজিদে মাইকে সকলকে একত্র হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এই সংবাদ নোয়াগাঁও গ্রামে পৌঁছালে গ্রাম থেকে থানায় ফোন দিয়ে জানানো হয়। সকাল ৮টার দিকে দা, রামদা, লাটিসোটা নিয়ে হামলা চালায়। আমাদের বাড়িতে নাচনি গ্রামের ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়া ও পক্কন মিয়ার নেতৃত্বে হামলা হয়।
উপজেলার নতুন নামকরণ ও নতুন উপজেলা ঘোষণা
দক্ষিণ সুনামগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল স্বতন্ত্র নামে উপজেলা ঘোষণার। ২৬ জুলাই প্রশাসনিক পূণর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১১৭ তম সভায় দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার নামকরণ হয় ‘শান্তিগঞ্জ উপজেলা’ এবং মধ্যনগর থানা হয়েছে ‘মধ্যনগর উপজেলা’। ঘোষণার পর থেকেই উপজেলাবাসী আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলাবাসী তাদের উপজেলার নাম পরিবর্তন করে একটি স্বতন্ত্র নাম হিসেবে শান্তিগঞ্জ উপজেলা নামকরণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
এদিকে, দূরত্বজনিত কারণে মধ্যনগর থানার চারটি ইউনিয়নের জনগণ চিকিৎসা, প্রশাসনিক সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহানোর কারণে মধ্যনগর থানাকে দীর্ঘ বছর ধরে উপজেলায় উন্নীতকরণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন এই অঞ্চলের মানুষ।
শিক্ষক সংকট
সুনামগঞ্জের ৫ টি সরকারি হাইস্কুলেই চরম শিক্ষক সংকট। তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে কয়েক বছর ধরে, জগন্নাথপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭-৮ বছর ধরে এই অবস্থা বিরাজমান। স্বাভাবিক সময়ে পাঠদানে হযবরল অবস্থা তৈরি হয়। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ না দিলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হবে। সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েও শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। জগন্নাথপুর স্বরূপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের একই অবস্থা। সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। মাধ্যমিক-উচ্চ শিক্ষার সিলেট বিভাগের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর কবির আহমদ জানিয়েছিলেন বিভাগে ৩০ ভাগ শিক্ষকের পদ শূন্য।
এদিকে জেলায় নতুন সরকারি হওয়া উচ্চ বিদ্যালয়গুলো হচ্ছে ছাতক বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও জামালগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে একই সমস্যায় ভুগছে।
রশি টেনে খেয়া পারাপার
দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের একপাড়ে আলীপুর বাজার, অপরপাড়ে টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডসহ টেংরাটিলা বাজার। মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে সীমান্তের ওপার (ভারতের মেঘালয় থেকে) থেকে নেমে আসা পাহাড়ী নদী। বর্ষায় পাহাড়ী ঢল নামলে প্রবল স্রোতের কারণে খেয়া নৌকা বন্ধ থাকে। খেয়া নৌকা চালানোর জন্য খাসিয়ামারা নদীর দুইপাড়ে রশি টানানো হয়েছে। স্রোতে ইঞ্জিন চালিত নৌকা হলে খরচ বেশি যায় এবং হাতে বাওয়া নৌকা হলে ভেসে যায় নৌকা। বিকল্প চলাচলের কোনো সুযোগ না থাকায় রোগী ও বয়স্কদের নিয়েও খাসিয়ামারা নদী ঝুঁকি নিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছেন মানুষজন।
খাসিয়ামারা নদীতে সেতু না থাকায় ৫০ হাজার মানুষ ভোগান্তি পোহাচ্ছে। ৫০ বছরেরও অধিক সময় থেকে রশির টানে খেয়া চলছে এই নদীতে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, শীঘ্রই সেতুর কাজ শুরু হবে।
কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ একনেকে ৫ অক্টোবর জগন্নাথপুর উপজেলায় কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট অনুমোদন দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ একনেক সভায় জগন্নাথপুর ও নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় ৩৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট বাস্তবায়ন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন লাভ করে। যার কাজ শুরু হয় চলতি বছরের জুলাই মাসে আর ২০২৬ সালের জুন মাসে সমাপ্ত হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
একনেকে উড়াল সেতু অনুমোদন
বর্ষাকালে বিচ্ছিন্ন থাকা হাওর অঞ্চলে জন্য হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, যোগাযোগে হচ্ছে উড়াল সেতুও। পাশাপাশি সাব মার্সিবল সড়ক ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণ হবে। এই লক্ষে হাওরে ঘেরা সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলাকে ঘিরে ‘হাওর এলাকায় উড়াল সড়ক ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
২৩ নভেম্বর তিন হাজার ৪৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘হাওর এলাকায় উড়াল সড়ক ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। হাওর সহিষ্ণু অবকাঠামো উন্নয়নপূর্বক হাওর অঞ্চলে সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজীকরণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন এবং উৎপাদিত কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণে সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেয়া হয়। তিন হাজার ৪৯০ কোটি টাকার প্রাক্কলিত এই প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে নভেম্বর ২০২১ থেকে জুন ২০২৫ মেয়াদে বাস্তবায়ন হবে।
প্রকল্পের আওতায় হাওর এলাকায় ১৭০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯৭ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার অল সিজন (উচুঁ বাঁধ দিয়ে নির্মাণ করা সড়ক, যা সব মৌসুমে ব্যবহার করা যাবে) উপজেলা সড়ক, ২০ দশমিক ২৭ কিলোমিটার অল সিজন ইউনিয়ন সড়ক, ১৬ দশমিক ৫৩ কিলোমিটার সাবমার্জিবল (বর্ষায় তলিয়ে যাবে শুষ্ক মৌসুমে যান চলাচল করবে) উপজেলা সড়ক এবং ২২ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার সাবমার্জিবল ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়ক নির্মাণ। এ ছাড়া ১০ দশমিক ৮১ কিলোমিটার এলিভেটেড (উড়াল) সড়ক এবং ৫ হাজার ৬৮৮ মিটার দৈর্ঘ্যের ৫৭ টি ব্রিজ ও ১১৮টি কালভার্ট নির্মাণ করা হবে।