ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি ভাস্বর

হোসেন তওফিক চৌধুরী
কালোত্তীর্ণ ও স্বমহিমায় উদ্ভাসিত ঐতিহ্য লালিত ভারতীয় উপমহাদেশ তথা এ অঞ্চলে উচ্চ শিক্ষার প্রাচীন বিদ্যাপিঠ আমাদের স্মৃতি ও গৌরবের ধারক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের পরম প্রবোধ ও প্রাপ্তি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা-দিক্ষা, চিন্তা-চেতনায় পূর্ব বাংলার পশ্চাতপদ মানুষ যে আলোর সন্ধান পেয়েছিল প্রকৃতপক্ষে সেই আলোর একমাত্র দিশারী ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামের খ্যাত আলোকিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালের ১ লা জুলাই যাত্রা শুরু করে। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর অসামান্য অবদান রয়েছে। পাকিস্তানের এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর পিতামহ নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীর অবদান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবিস্বরণীয়। নবাব সলিমুল্লার নামানুসারেই বিশ্ববিদ্যলয়ের প্রথম ছাত্রাবাস এশিয়ার বৃহত্তম ছাত্রহল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও বিরোধিতা হয়েছে। কিন্তু সকল বাধা বিপত্তি ডিঙিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এবার ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার একশত বৎসর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন অভূতপূর্ব। বিশেষভাবে রাজনৈতিক চেতনায় এবং জনমানষের ভিত্তি তৈরিতে এই প্রতিষ্ঠানের জুড়ি নেই।
আমার প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সবার শীর্ষে। আমি ১৯৬৫ সালে সুনামগঞ্জ থেকে স্মাতক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস (সাধারণ) বিভাগে ভর্তি হই। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করি। অবস্থান করেছি আবাসিক ছাত্র হিসাবে ঐতিহাসিক এস.এম হলে। ১৯৬৯ সালে আমি এম.এ ডিগ্রি প্রাপ্ত হই আর সেন্ট্রেল ল কলেজ থেকে একই সাথে এলএল.বি ডিগ্রি নিয়েছি। আমার স্মৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এস.এম হল উজ্জল ও ভাস্বর হয়ে আছে। ৫৩ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়লেও আমি বিশ্ববিদ্যালয় ও এস.এম হলের কথা ভুলতে পারি না। আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। যেদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেদিন ছিলাম আনন্দ আপ্লোত, গৌরবে মন ও বুক ভরেগিয়েছিল। আর যেদিন স্মৃতিময় বিশ্ববিদ্যালয় ও হল ত্যাগ করি সেদিন আমি ছিলাম বেদনা বিধূর। চোখ ছিল অশ্রুপূর্ণ।
আমাদের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য বা ভাইস-চ্যান্সেলর ছিলেন ড. এম.ও গনি। তিনি এর আগে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর ছিলেন। ইতিহাস বিভাগের প্রধান ছিলেন ড. হালিম। বিভাগীয় প্রফেসর-অধ্যাপকদের মধ্যে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের ভাই ওয়াদুদুর রহমান, ড. মোহর আলী, ড. আব্দুল মমিন চৌধুরী, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য্য, ড. আবুল খয়ের, ড. গিয়াস উদ্দিন, ড. কে.এম. মহসিন, ড. সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ ছিলেন। এরা সবাই ছিলেন আদর্শবান ও নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক। ক্লাসে তাদের বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনলে এবং নোট নিলে পড়াশুনার দরকার পড়তনা। এই শিক্ষক মন্ডলির মধ্যে ড. আবুল খয়ের, গিয়াস উদ্দিন ও সন্তোষ ভট্টাচার্য্য ১৯৭১ সালের শেষ দিকে মুক্তিযোদ্ধের সময়ে আলবদর, আলসামসদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন।
এস.এম হল মোঘল স্থাপত্তের নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই হলটির ব্যাপকতায় এবং সৌন্দর্য্যে এই হলটিকে এশিয়ার বৃহত্তম ছাত্রাবাস বলেই পরিণত হয়। এস.এম হলের ভিতরে বাগান এবং এস.এম হলের সামনে টেনিস মাট। হলটির সৌন্দর্য্য অনেকাংশে বৃদ্ধি করে। হলটি প্রায় একশত বছর পরেও আগের মতন সৌন্দর্য্য মন্ডিত আছে। আমাদের সময়ে হলের প্রভোষ্ঠ ছিলেন ড. মফিজ উদ্দিন আহমদ। আমি ইস্টহাউজে ছিলাম। আমাদের হাউজ টিউটর ছিলেন ইতিহাসবিদ ড. আব্দুল করিম। দৈনিক অবজারবার পত্রিকার এককালীন সম্পাদক ড. কে.এম.এ মমিন ও ইস্টহাউজের একজন হাউজ টিউটর ছিলেন। আমি এস.এম হলে থাকা অবস্থাই ঢাকার দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সহ-সম্পাদক নিযুক্ত হই। এস.এম হলে সিট পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর ছিল। আমি প্রথমে সিট না পেয়ে মিলনায়তনে ফ্লোরিং করতাম। পরে তদানিন্তন সরকারের লিডার অব দি হাউজ দেওয়ান আব্দুল বাসিত সাহেবের চিঠি এনে সিট পাই। জনাব বাসিত সাহেব আমার পিতা মকবুল হোসেন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমাদের সময়ে ছাত্রদের মধ্যে এমএম হলের আবাসিক ছাত্র নূর মোহাম্মদ খান, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফখরুল ইসলাম মুন্সী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রী সভায় মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন আমার পাশর্^বর্তী রুমে আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার হৃদতা। সাংবাদিক নেতা, সম্পাদক এবং ঢাকা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রিয়াজউদ্দিন আহমদ এবং গোলা তাহবুর এসএম হলে ছিলেন।
আমাদের সময়ে বিভিন্ন হলের ছাত্র সংসদ নির্বাচন ছিল অত্যন্ত জমজমাট। বিপুল উদ্বিপনার মধ্যদিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। এতে কেন্দ্রিয় নেত্রীবৃন্দ হলে এসে ছাত্র সমাবেশে বক্তৃতা করতেন। সাধারণনত হলের সভাগুলো রাতে বেলাই অনুষ্ঠিত হতো আর দিনের বেলা ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিনে অনুষ্ঠিত হত। ছাত্র নেত্রীবৃন্দের মধ্যে কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, মাহবুবুল হক দোলন, বেগম মতিয়া চৌধুরী, আব্দুল রাজ্জাক, জমির আলী, আব্দুল মন্নান ভূইয়া, আল মুজাহিদি, মাহবুব উল্লাহ, মতিউর রহমান নিজামী প্রমুখ বক্তৃতা করতেন। রাজনৈতিক চেতনা বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শীর্ষে। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা পেশ করার পর রাজনৈতিক গুণগত পরিবর্তন সূচিত হয় এবং রাজনৈতিক নতুন মোড় গ্রহণ করে তখন বিভিন্ন ছাত্র সভায় স্লগান শুনাযেত “তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা”। স্বাধীনতার চেতনা ধীরে ধীরে বিকশিত হতে শুরু করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সুতিকাগারে পরিণত হয়। এর আগে মহান ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধি আন্দোলন সহ প্রতিটি গণমুখী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্রদের অবদান অনন্য হয়ে রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ কয়েক যোগ পর বিশ্ববিদ্যালয়ের তথা আমার স্মৃতির উপর নির্ভর করেই লিখিত হয়েছে। বিস্তারিতভাবে লিখতে গেলে এই ছোট নিবন্ধে তা সম্ভব নয়। আমাদের পরিবারের ৩ জন সদস্য উপমহাদেশের ৩ টি প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া ও ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ পেয়েছি। আমার চাচা ইকবাল হোসেন চৌধুরী (সাবেক জেলা জজ) আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও আমার অনুজ সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ও এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়াও আমার চাচাত ভাই বোন ও ২ ভাতিজি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছে। শিক্ষা বিস্তারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভূতপূর্ব অবদান রেখেছে এবং পূর্ববঙ্গের মানুষদেরকে শিক্ষাদিক্ষায় সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে জাগিয়ে তুলেছে। আগামী দিনের ইতিহাসে অবশ্যই এসব কথা সোনালী হরফে লেখা থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস গৌরব ও সৌরভের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই আমাদের এই অঞ্চলের নবজাগরণের সৃষ্টি করেছে বললে অত্যক্তি হবে না। এখানে স্মরণ যোগ্য যে, ঢাকা বিশ^বিদালয়ের সিনেটে আসাম সরকারের প্রতিনিধি থাকতেন। সিলেটের এমএলএ দেওয়ান একলিমুর রাজা চৌধুরী ও আমার পিতা এমএলএ মকবুল হোসেন চৌধুরী তদানীন্তন আসাম সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সিনেট সভার সদস্য ছিলেন।
লেখক আইনজীবী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে সংক্ষিপ্তকারে এই প্রবন্ধ লিখিত।
আইনজীবী-কলামিষ্ট।