বন্ধন থেকে বন্ধু শব্দের উৎপত্তি। বন্ধু মানে একজন আরেক জনের সাথে প্রকৃষ্ট বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। একজন আঘাত পেলে আরেকজন কষ্ট অনুভব করে, একজন আনন্দ পেলে অন্য বন্ধু উদ্বেল হয়- এমনই মনের সম্পর্ক থাকে বন্ধু-বন্ধুয়। বন্ধু যখন ঘাতক হয়ে উঠে তখন সে কিসের বন্ধু? গণমাধ্যমে সংবাদ হয়েছে ‘বন্ধুর ছুরিকাঘাতে বন্ধু খুন’। এরকমটি হতেই পারে না। কোন বন্ধুই তার আরেক বন্ধুকে নিজ হাতে খুন করতে পারে না। সে তো নয়ই, অন্য কেউ যদি এরকম পরিকল্পনা করে তাহলে জান বাজি রেখে সে বন্ধুকে বাঁচিয়ে দিবে। কিন্তু বলা হচ্ছে পৌর শহরের পুরাতন বাসস্টেশনে নয়ন মিয়া নামক ছেলেটি তার বন্ধু রেজুয়ানের হাতে খুন হয়েছে। কী ভয়ংকর অবনমন এই সমাজের। ঘাতক সে তো কারও বন্ধু হওয়ার উপযুক্ত নয়। সে সমাজ-সংসার, সভ্যতা ও মানুষের শত্রু। রেজুুয়ান বাহ্যত নয়নের বন্ধুরূপে এতদিন নিজের মিথ্যা পরিচয় তুলে ধরেছিল। সম্পর্কের এই ভ্রমাত্মক ধারণাটি নয়নের মৃত্যুর পরও রয়ে গেছে। তাই বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন এমন কথাটি সামনে আসতে পারে। মূলত রেজুয়ান কোন বন্ধু নয়, না নয়নের- না আর কারও। সে কেবলই একজন খুনী।
প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, মাত্র ৪২০ টাকা দেনা-পাওনা নিয়ে এই দুই বন্ধুর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে রেজুয়ান অন্যদের সহায়তায় নয়নকে চেপে ধরে ছুরিকাঘাত করে। এতে নয়ন নামের এই তরতাজা যুবকের মৃত্যু ঘটে। নয়নের কাছ থেকে ওই পরিমাণ টাকা ধার নিয়েছিল রেজুয়ান। টাকা চাইতে গেলে ক্ষিপ্ত হয় রেজুয়ান। ভয়ংকর এক সমাজ বাস্তবতার নির্মম প্রকাশ এই ঘটনা। একটি মানুষকে মেরে ফেলা যায় স্রেফ ৪২০ টাকার জন্য। আর মেরে ফেলার জন্য চাকুও মজুদ থাকে পকেটে। রেজুয়ান কি চাকু পকেটে নিয়েই ঘুরে বেড়ায়? হবে হয়তো। এখনকার তরুণ সমাজের মনস্তত্ত্ব সাংঘাতিক হিংস্রতা আর হতাশায় পরিপূর্ণ। এরা নিজেকে উপরে তোলে ধরতে চায়। দেখাতে চায়- ক্ষমতায়-শক্তিতে সে আর সবের চাইতে বড়। তাই শক্তি প্রদর্শনের যাবতীয় উপকরণ হাতের নাগালেই রাখে তারা। সমাজে ভাল কোন উদাহরণ নেই, নেই অনুকরণ করার মত চরিত্র। সর্বত্র সর্বগ্রাসী পরাক্রমশীলতা দেখানোর প্রতিযোগিতা। তরুণ সমাজকে সঠিক পথের সন্ধান দিবেন যারা তারা এখন এই সমাজকে নিজের অনুগত করে রাখতে চায়। তরুণদের প্রলোভিত, প্রতারিত করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার করে রাখতে চায় এরা। সুতরাং তরুণরা শিখছেÑ ন্যায়-অন্যায় নয়, কেবল এক অন্ধ আনুগত্যে ঝাঁপিয়ে পড়া। এরই বিষফল এইসব রেজুয়ানরা। যারা কথায় কথায় ছুরি চালাতে এতটুকু কম্পিত হয় না।
নয়ন মাত্রই জীবন শুরু করতে চলেছিল। তাকে নিয়ে তার পরিবারের স্বপ্ন-সাধ পাতা মেলতে শুরু করেছিল কেবল। এক ঘাতকের হাতে ওই স্বপ্ন-আহ্লাদের করুণ মৃত্যু ঘটল। নয়নের পরিবার-স্বজন এই স্বপ্ন হারানোর বেদনা ভুলবেন কী দিয়ে? আমরা জানি না। কেউ জানে না। এই নিষ্ঠুরতার বলি নয়নের পরিবারকে শান্ত¡না দেয়ার ভাষা নেই। রেজুয়ান ও তার খুনের সহযোগী রুহানকে পুলিশ আটক করেছে। হয়ত আইনের মাধ্যমে এদের শাস্তি হবে অথবা প্রমাণাদির অভাবে কিছুই হবে না। এই হওয়া বা না হওয়ায় নয়ন ফিরে আসবে না, তার পরিবারের অসহায় চোখে একটুও স্বস্তির আভাস দেখা যাবে না। নয়নের পরিবারকে আজীবন এই শোক ও কষ্ট বয়ে বেড়াতে হবে। কী এক করুণ ও কষ্টকর জীবন যাপন হবে তাদের। কিন্তু ঘাতক রেজুয়ান ও তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হওয়া কাম্য এই কারণে যে, মানুষ বাঁচতে চায়। মানুষের বেঁচে থাকার সহজাত অধিকারবোধ বলে- চিহ্নিত ঘাতকরা মুক্ত থাকলে ওই অধিকারবোধ আর থাকে না। নয়নের ঘাতকদের সর্বোচ্চ শান্তির জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটুক।

