কল্যাণধর্মী পরিকল্পনার ক্ষতিকর পরিণতি

অধ্যক্ষ মোঃ ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। পাহাড়ি নদী খাসিয়ামারা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া পাহাড়ে উৎপত্তি হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বৃহত্তর লক্ষীপুর তথা বর্তমান লক্ষীপুর, বোগলাবাজার ও সুরমা ইউনিয়ন সমূহের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নূরপুর গ্রামের পাশে সুরমা নদীতে মিশেছে। উভয় তীরের কৃষকগণ উক্ত পাহাড়ি নদীতে মাটির বাঁধ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে ইরি ও বোর ধান চাষাবাদ করতেন। তাঁদেরকে সহজে পানি সরবরাহের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এল.জি.ই.ডি) কর্তৃপক্ষ একটি কল্যাণধর্মী প্রকল্প গ্রহণ করে ২০০৩-০৪ থেকে শুরু করে ২০০৪-০৫ সনে মহব্বতপুর বাজারের পশ্চিম পাশে প্রায় একশত মিটার প্রশস্ত খাসিয়ামারা নদীতে মাত্র ৪৫ মিটারের একটি ব্রিজ ও রাবার ড্যাম নির্মাণ করে। প্রথম কিছুদিন এলাকার কৃষকগণ এর দ্বারা খুব উপকৃত হন। তাঁরা প্রচুর ধান গোলায় উঠাতে সক্ষম হন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, পরবর্তীতে বর্ষায় পাহাড়ি ঢল নেমে এসে ড্যামের উজানে দুকূল ছাপিয়ে কখনও ডানতীরের আবার কখনও বামতীরের বাঁধ ভেঙে ফেলে, অগণিত কৃষকের ফসল ধ্বংস করে, অনেক জমিতে বালি জমিয়ে উর্বরতা বিনষ্ট করে, বহু বাড়ীঘর-গাছপালা ধ্বংস করে ফেলে এমনকি দোয়ারাবাজার-বোগলাবাজার পাকা রাস্তাটিও ভেঙে ফেলে। রাবার ড্যামটি নির্মাণ কালে নদীর স্বাভাবিক গভীরতা থেকে কিছু উঁচুতে স্থাপনের ফলে এর উজানে বালি জমে নদীর গভীরতা আরও হ্রাস পেয়েছে। ফলে বর্ষার সময় পাহাড়ি ঢলের পানি আরও বেশি ফুলে ফেঁপে উঠছে। লিয়াকতগন্জ বাজার সহ অনেক স্থান প্রায় বর্ষাতেই ভাংগন কবলিত হচ্ছে। দুই তীরের বাঁধ প্রতি বছর বাধ্য হয়ে উঁচু করতে হচ্ছে যার ফলে বর্তমানে বাঁধের (শুধুই বালি দ্বারা নির্মিত) উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়ায় অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। ভুক্তভোগী জনসাধারণ কষ্টের জন্য প্রাকৃতিকে দায়ী করেন, ব্যবস্থা গ্রহণ না করার জন্য সরকারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং জনপ্রতিনিধিগণের প্রতি অভিযোগের তীর ছোঁড়েন।
আমি ২০১৪ -১৯ মেয়াদে দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালে একাধিকবার এল.জি.ই.ডি এর প্রকৌশলীগণের সঙ্গে পরিদর্শনের সময় স্বীয় অভিজ্ঞতা শেয়ার করার সুযোগ পেয়ে তাঁদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করি যে, নদীটির প্রস্থ উজানে ও ভাটিতে প্রায় ১০০ মিটার, ড্যামের স্থানেও উভয় তীরের বাঁধের দূরত্ব ১০০ মিটারের অনেক বেশী থাকায় অতীতে সহজেই পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশন হত। কিন্তু এই নদীতে মাত্র ৪৫ মিটারের ড্যাম ও ব্রিজ নির্মাণ করে দুই তীরের বাঁধ পর্যন্ত ফাঁকা স্থান ভরাট করে দেওয়ার ফলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে যাওয়ার কোন সুযোগ না পেয়ে উপচানো পানি ফুলে ফেঁপে কখনও এপারে আর কখনও সেপারে উজানের বাঁধ ভেঙে ফেলছে। নদীটির কোনো শাখা না থাকায় কোন বিকল্প পথেও পানি নেমে যাওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে ব্রিজসহ ড্যামটি একেবারে অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং কৃষককূল ও এলাকাবাসীর জন্য দারুণ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য বিধায় ড্যামের দুপাশে দুটি স্লুইস গেইট নির্মাণ করে বর্ষার পানি নিষ্কাশনের সুযোগ করে দিতে আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম। তাঁরা এ ব্যাপারে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু কোন সুফলদায়ক ব্যবস্থাই গৃহীত হতে দেখা যায় নাই। উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি এল.জি.ই.ডি কর্তৃপক্ষ এই খাসিয়ামারা নদীতে আলোচিত রাবার ড্যামের উজানে ও ভাটিতে (কমিবশী) একশত মিটার দীর্ঘ ব্রিজের পরিকল্পনা গ্রহণ করে ইতোমধ্যে একটির নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন। এতে রাবার ড্যাম ও ব্রিজের নির্মাণকালীন পরিমাপের ভুল সম্পর্কিত আমার উত্থাপিত যুক্তিসমূহ অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়। কারণ উজান থেকে শত মিটার প্র্রশস্ত নদীর পানি রাবার ড্যামের মাত্র ৪৫ মিটারের ভেতর দিয়ে কিভাবে নিষ্কাশিত হতে পারে ?
এল.জি.ই.ডি কর্তৃপক্ষ একাধিক বার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ড্যামের উজানে ও ভাটিতে সি সি ব্লক নির্মাণ করে বসিয়েছেন। কিন্তু কোন সুফল পান নাই। প্রায় বছরই ঢলের পানি নিষ্কাশনের সুযোগ না পেয়ে জমিন – ফসল, বাড়ী-ঘর, রাস্তা-ঘাট ভেঙে ভয়ংকর বিনাশী রূপ নিয়ে নেমে যাচ্ছে। খাসিয়ামারা নদীর দুই তীরের বিপন্ন মানুষজনের নিত্যদিনের ভোগান্তি আরও বেড়ে গেছে। এখানে মূল পরিকল্পনার ভুলে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে আর কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্পটি বর্তমানে একেবারেই নিষ্ফলা হয়ে ভুক্তভোগী কৃষকদের দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কল্যাণধর্মী এই পরিকল্পনাটির ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে এলাকাবাসী জনগণ, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং সর্বোপরি সরকারকেও। অবশ্য এলাকার কৃষকগণ অতীতের মত নদীটিতে শুষ্ক মৌসুমে মাটির বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকিয়ে পাওয়ার পাম্পের সাহায্যে জমিতে পানি উঠিয়ে (যদিও অধিক ব্যয়সাধ্য ) আংশিক জমিতে ফসল ফলানোর ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছেন।
এমতাবস্থায় এল.জি.ই.ডি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে পূর্ব নির্মিত বাস্তবিক পক্ষেই ছোট ব্রিজ ও রাবার ড্যামটি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলে নতুনভাবে সম্প্রসারিত সত্যিকার কল্যাণধর্মী বাস্তবভিত্তিক প্রশস্ততা ও গভীরতাসম্পন্ন শত মিটারের ব্রিজ ও ড্যাম নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতঃ বর্ষার পানির সহজে নিষ্কাশনের সুযোগ দান এবং নদীর দুই তীরের কৃষকগণকে শুষ্ক মৌসুমে ইরি ও বোর ধান ফলানোর সাশ্রয়ী সুব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন এটাই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।