স্টাফ রিপোর্টার
এক পরিবারের দুইজনের নামে দুইটি পিআইসি’র কাজ দেয়া হয়েছে। এই দুই পিআইসি’র বরাদ্দ অর্ধ কোটি টাকার উপরে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের চলতি নদীর ডান তীরে ফসলরক্ষা বাঁধ মেরামতের জন্য এই বরাদ্দ দেয়া হয়। সোমবার পর্যন্ত বাঁধে মাটি ভরাটের কাজ হয়েছে মাত্র ৭০ ভাগ।
২৮ নম্বর পিআইসিতে ২৭ লক্ষ, ৬০ হাজার, ৪৪৭ টাকা এবং ২৯ নম্বর পিআইসিতে ২৬ লক্ষ, ২৫ হাজার ৪৮ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। দুই পিআইসিতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ ৫৩ লক্ষ ৮৫ হাজার ৪৯৫ টাকা।
২৮ নম্বর পিআইসির সভাপতি মো. আনিছুর রহমান। তিনি ২৯ নম্বর পিআইসির সভাপতি মোহাম্মদ মাসুদুর রহমানের আপন চাচাতো ভাই। এই পরিবারের সদস্যরা সরকার দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
সোমবার বিকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই দুই পিআইসি’র বাঁধে মাটি ভরাটের কাজ হচ্ছে। স্থানীয় একাধিক কৃষক জানান, ২৮ নম্বর ও ২৯ নম্বর পিআইসি’র বেড়িবাঁধের কাজ এবার ভাল হচ্ছে না। মাত্র কয়েকদিন আগে বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। এখনও চলছে মাটি ভরাটের কাজ। এই পরিবারের লোকজন এলাকায় সরকার দলীয় পরিচয়ে দাপটে চলাফেরা করেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। বাঁধ নির্মাণের কমিটিতেও নিজের আত্মীয় স্বজনদের রাখা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক আশিক আলীকে বাঁধ নির্মাণ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, হায়রে বেড়িবাঁধ। বাঁধ নির্মাণ এখন প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে নেই। যারা দল করে, দাপট আছে, তারাই নির্মাণ করে বেড়িবাঁধ। আমরা শুধু চেয়ে থাকি। এমনও পিআইসি সভাপতি, সদস্য আছেন, যাদের জমি আছে কিন্তু জীবনে একবার জমিতে ধান দেখতেও আসেন না। আজ তারাই দূরে থেকে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করছেন। বাঁধের পাশেও দেখা যায় না।
অপরদিকে, চলতি নদীর ডান তীরে ফসলরক্ষা বাঁধের ২৬ নম্বর পিআইসি’র কাজ এখনও শেষ হয়নি। সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁধে দুর্মুজ করা হয়নি, ঘাস নেই। বাঁধের কিছু কিছু স্থানে মাটি ভরাটও নেই। এই বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৩ লক্ষ, ৭৬ হাজার, ১৪৮ টাকা।
চলতি নদীর ডান তীরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে দেয়া হয়েছে ২৭ নম্বর পিআইসি। এই পিআইসি’র বাঁধ নির্মাণে মাটি ভরাটের কাজ চলছে এখনও। এই বাঁধে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৯২৮ টাকা।
এদিকে, ভাদেরটেক এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৮ নম্বর পিআইসি’র বেড়িবাঁধের কাজ এখনও শেষ হয়নি। রবিবার ভাদেরটেক এলাকায় একটি ভাঙনসহ ৫ স্থানে সামান্য মাটি ফেলে ভাঙা সংস্কার ও বাঁধ মেরামত হয়েছে। কিন্তু বাঁধে ঘাস লাগানো, দুর্মুজ করা, ড্রেসিং করা হয়নি। এছাড়া বাঁধের দৈর্ঘ্য, প্রস্ত, উচ্চতা, ঢালু নিয়েও সন্দেহ আছে স্থানীয় কৃষকদের।
স্থানীয়রা জানান, ভাদেরটেক গ্রামের দক্ষিণ পাশে একটি ভাঙনে সামান্য মাটি ফেলে সংস্কার করা হয়। এই মাটি উত্তোলন করা হয়েছে বাঁধের পাশে থেকে। ভাঙন সংস্কারে পর্যাপ্ত বাঁশ পোঁতা হয়নি, ঘাস লাগানো নেই, দুর্মুজ নেই, বস্তা ফেলা হয়নি। বাঁধের উচ্চতা ও প্রশস্ততা নিয়েও নানা সন্দেহ আছে কৃষকদের। ভাদেরটেক উত্তরপাড়ার ফজলু মিয়ার দোকানের সামনে একেবারে সামান্য মাটি ফেলা হয়েছে। এই সড়কের পাশের বেড়িবাঁধে এবং একই সড়কের মীনাজুরী কালভার্ট সেতুর উভয় পাশে অল্প পরিমাণে মাটি ফেলা হয়েছে। এসব কাজে কোনো দুর্মুজ নেই, ঘাস লাগানো নেই। বাঁধের দৈর্ঘ্য, প্রস্ত ও প্রশস্ততা নিয়ে আছে স্থানীয়দের সন্দেহ।
সরেজমিনে গিয়ে বাঁধের কাজের তথ্য সম্বলিত কোনো সাইনবোর্ড পাওয়া যায়নি। এ সময় একাধিক কৃষক জানান, বাঁধের কাজ কত টাকা বরাদ্দ সেটাও কেউ জানেন না। বাঁধের বিভিন্ন স্থানে মেরামত কাজের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা বলে ৮ নম্বর পিআইসি’র সভাপতি ফজলু মিয়া জানান। তিনি জানান, এই কমিটিতে রয়েছেন গ্রামের জাতীয় পার্টীর নেতা আব্দুল কাদির। কিন্তু আব্দুল কাদির জানান, তিনি এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না। কমিটিতে আছেন ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহ পরান। রবিবার ও সোমবার একাধিক বার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে ডিসি সাহেবের সাথে এবং ইউএনও সাহেবের সাথে জরুরি সভায় আছেন বলে ফোন কেটে দেন তিনি। এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রদান করতে নারাজ ইউপি সদস্য শাহ পরান।
৮ নম্বর পিআইসির সদস্য সচিব শাহেদ আলী বলেন, ভাদেরটেক দক্ষিণপাড়ায় গজারিয়া নদীর বাঁধের একটি অংশে কাজ হয়েছে। এই কাজ পার্টিগতভাবে আনা হয়েছে। বাঁধে ঘাস লাগানো ও দুর্মুজ করা হয়নি। সাইনবোর্ড বাড়িতে রাখা হয়েছে। মাঝে মাঝে এই সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয় বাঁধের পাশে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মনছুর রহমান বলেন, পিআইসির কাজে কোনো অনিয়ম হলে খুঁজে দেখা হবে। বাঁধের কাজ ভালভাবে করার জন্য বলে দেয়া হয়েছে কমিটির লোকজনকে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের পিআইসি’র বেড়িবাঁধের কাজ কি পরিমাণে এবং কেমন হয়েছে এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে দেখা হবে।
- লন্ডনির অর্থায়ণে টিনসেডের বসতঘর পেল দরিদ্র কৃষক পরিবার
- তাহিরপুরে গ্রাম প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ


