এলজিইডি কর্তৃক বাস্তবায়িত হিলিপ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয় উপকারভোগী ও প্রকল্পের যৌথ ব্যবস্থাপনায়। হিলিপের আওতায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় একটি সমিতি গঠন করা হয়। এই সমিতির মাধ্যমে উন্নয়ন কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয়। অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা হিসাবে এটি বেশ চমৎকার। এই ব্যবস্থায় কাজের বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় থাকার কথা। কিন্তু আমরা সকলেই যে বাঙালি, একই উৎস থেকে আগত। সুতরাং স্বভাব—চরিত্র পালটানোর উপায় কই? তাই সমিতির ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হলেও সেই টাকা আত্মসাৎ হয়ে যায়। ঘটনা বেমালুম চাপা পড়ে। কোন এক অদৃশ্য কারণে সাত বছর পর মাটি খঁুড়ে একটি ঘটনার প্রকাশ হয়ে পড়ল বলে সকলেই জানতে পারলেন। নতুবা সাত বছরে মাটির সাত মাইল নীচে এই আত্মসাৎকাণ্ড চাপা পড়ে থাকত। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর থেকে জানা যায়, শাল্লা উপজেলার আনন্দপুর বাজারে ১০০ মিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের জন্য ২০১৪—২০১৫ সনে ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩১ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে হিলিপ। এজন্য সংশ্লিষ্ট সমিতির সভাপতি ও সম্পাদকের নামে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৪৯ টাকা প্রাথমিকভাবে ছাড় করা হয়। ওই টাকা দিয়ে কিছু নির্মাণ সামগ্রী কিনে নির্মাণস্থলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এরপর আর কোন কাজ নেই। একসময় নির্মাণসামগ্রী বিক্রিও হয়ে যায়। প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি করা তো দূরস্ত। সকলেই ভুলে বসেছিলেন ঘটনাটি। কিন্তু কী কারণে জানি মাটি খঁুড়ে সাপ বের করে আনা হলো। আনন্দপুর বাজারের ব্যবসায়ীরা ৭ বছর আগের ওই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরব হলেন। তারা লিখিত অভিযোগ আনলেন। এখন একজন অন্যজনের উপর দোষ চাপাচ্ছেন। সমিতির সভাপতি—সম্পাদক অভিযোগ করছেন তৎকালীন ইউপি মেম্বারের উপর। হিলিপি সমিতির সভাপতি ধীরেন্দ্র বিশ^াস গণমাধ্যমকে বলেছেন, টাকা নিয়ে গেছেন তৎকালীন ইউপি মেম্বার মিহির রায়। মিহির রায়ই বিক্রি করেছেন মালামাল। প্রকল্পের কর্মসহকারী মোরশেদ আলমও মিহির রায়ের কথাই বলেছেন। কিন্তু মিহির রায় যথারীতি অভিযোগ অস্বীকার করে তথাকথিত গ্রাম্য বিরোধের জেরের কথা সামনে নিয়ে আসলেন। আমরা অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি, সমিতির সভাপতি বা সম্পাদকরা নামেমাত্র থাকেন নিধিরাম সর্দারের মত, আসল ক্ষমতা থাকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রকল্প কর্মচারীদের। এই অভিজ্ঞতা বলে, মিহির রায় ও প্রকল্প কর্মকর্তা—কর্মচারীরা পারষ্পরিক যোগসাজসেই অপকাণ্ডটি করেছেন। কিন্তু কাগজেপত্রে তাদের ধরার উপয় কই? উপায় যেটি আছে তাহলোÑ স্বাক্ষ্যপ্রমাণাদি আমলে নেয়া। তা কি নেয়া হবে?
হিলিপের এই আনন্দপুর প্রজেক্টেই যে কেবল দুর্নীতি হয়েছে তা নয়। বরং উপজেলার নোয়াগাঁও, পুটকা, গোবিন্দপুর, কার্তিকপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বাস্তবায়িত সকল উন্নয়ন প্রকল্পেই এরকম দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে প্রকাশিত সংবাদে। এই দুর্নীতি হওয়া নিয়ে কোন ধরনের সন্দেহ নেই। বরং দুর্নীতি না হওয়াটাই একেবারে অচিন্তনীয় ব্যাপার বটে। তা দুর্নীতি যে বরাদ্দের শতভাগই করা হয়ে যাবে, সেটি বোধকরি কেউ ভাবেননি। এখন দেখার বিষয় হলÑএসব কথিত—অকথিত দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে এলজিইডি ও হিলিপ কী করে। সরকারি সকল কাজে দুর্নীতির এই যে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও অবাধ চর্চা শুরু হয়েছে তার শেষ কোথায়? আমরা জানি না। কেউ জানে না। এক অন্তহীন অন্ধকারের দিকে আমরা যাত্রা শুরু করেছি। কোথায় গিয়ে পতনের শেষ হবে তা দেখার অপেক্ষা শুধু।
শাল্লার আনন্দপুরে কিংবা অন্যত্র হিলিপের আওতায় যেসব দুর্নীতি সংঘটিত হলো এবং দুর্নীতিগুলো ৭ বছর পর্যন্ত চাপা থাকল, এখন অন্তত উত্থাপিত দুর্নীতির বিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় কি—না তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম আমরা।

