এনামুল হক, ধর্মপাশা
সরকারি হিসেবে ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার কোনো বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে আর কেউ নেই। বন্যা পরবর্তী সময়ে প্রত্যেকেই বাড়ি ফিরেছেন। যে যার মতো করে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। কেউ ভাঙা ঘর মেরামত করেছেন আবার কেউ পুরো বিধ্বস্ত হওয়া ঘর পুননির্মাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পঞ্চাশোর্ধ বিল্লাল হোসেন এখনও তার পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেননি। এখনও অবস্থান করছেন মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সে।
বিল্লাল হোসেন জানালেন, তাঁর দুই পা অচল। ফলে তিনি হাঁটতে পারেন না। ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের খানিকটা উত্তরে তাঁর বসতভিটা। বন্যার পানি এতোটাই দ্রুত বেড়েছিল যে তাঁরা এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। বর্গা চাষ করে যে ধান পেয়েছিলেন তাও নিরাপদ স্থানে সরাতে পারেননি। ফলে খাবার সংকটে রয়েছেন তিনি। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ্য থাকায় এখন নিয়মিত অসুধও কিনতে পারছেন না। যদিও বসতঘর পুননির্মাণের জন্য ১০ হাজার টাকা সরকারি সহায়তা পেয়েছেন। কিন্তু সেই সহায়তা দিয়ে কোনো রকমে একটি চাপড়া ঘর নির্মাণ করা যাবে। কিন্তু বন্যায় তাঁর যে অপুরনীয় ক্ষতি হয়েছে তা কোনোভাবেই কাটিয়ে ওঠা যাবে না।
গত মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা যায়, বিল্লাল হোসেন ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের একটি কক্ষে শুয়ে আছেন। একই কক্ষে চলছে রান্না বান্নার কাজ। ঘর পুননির্মাণের জন্য যে সরকারি সহায়তা পেয়েছেন তা দিয়ে তাঁর দুই ছেলে কোনো রকমে একটি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। একই আশ্রয় কেন্দ্রের অন্য কক্ষে আরও কয়েকটি পরিবারকে পাওয়া গেল যারা এখনও বাড়ি ফিরতে পারেননি। আর বিল্লাল হোসেন যে কতটা অসহায় তা বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রাসেল আহমদের সাথে কথা বলে স্পষ্ট জানা গেল। তিনি জানালেন, বিল্লাল হোসেন অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে তার টিনশ্যাড ঘরটি করতে ৫/৬ সময় নিয়েছিলেন। আর মূহুতের্ই তার ঘরটি মাটির সাথে মিশে যায়। তাঁর পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
একই ইউনিয়নের দক্ষিণউড়া গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী রতন সরকার ১৬ জুন রাত রাত ১০টার মধ্যে পরিবারের লোকজন নিয়ে স্থানীয় আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেন। ঘন্টাখানেক পরে শুরু হয় বজ্রপাত। আকস্মিক বজ্রপাতে রতন সরকারের ঘরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। সেই আগুনে বসত ঘরের ভেতরে থাকা ধান, চালসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। রতন সরকার এখন সরকারি সহায়তায় একটি টিনের চাপড়া ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন।

ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় এবারের বন্যায় অন্তত কয়েক হাজার ঘর বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। যার তথ্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্টদের কাছে জমা দেন। এসব তথ্য যাচাই বাছাই করে বন্যা পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে প্রথম পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। যা দিয়ে ২৮০টি ঘর পুননির্মাণ করার জন্য প্রতি উপকারভোগীকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে জিআর ক্যাশ ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব বরাদ্দের টাকা ধর্মপাশা উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ১২০ জন ও মধ্যনগর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে ১০০ জনসহ মোট ২২০ জনের মাঝে ৫ হাজার টাকা করে বিতরণ করা হয়।
মধ্যনগর ইউপি চেয়ারম্যান সঞ্জিব রঞ্জন তালুকদার টিুট বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ১০ হাজার টাকা করে ৩৮ জন ও ৫ হাজার টাকা করে ২৫ জন সহায়তা পেয়েছেন। কিন্তু এখানে শতাধিক লোকের চাহিদা রয়েছে।’
সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান নাসরিন সুলতানা দিপা বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের দুই হাজারের ওপর ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু পুনর্বাসনের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়।’
ধর্মপাশা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রজেশ চন্দ্র দাস বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল ও জিআর ক্যাশ থেকে বরাদ্দকৃত অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। কোনো আশ্রয় কেন্দ্রে এখন আর কেউ নেই।’
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির হাসান বলেন, ‘ইতোমধ্যে ধর্মপাশা উপজেলার জন্য ১০০ বান ও মধ্যনগর উপজেলার জন্য ১৫০ বান টিন বরাদ্দ পাওয়া গেছে। তা দ্রুত বিতরণ করা হবে।’
সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবার যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে সে জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’


