দিরাইয়ে উত্তরণের দৃষ্টিনন্দন কাঠের সেতু/ বাঁচবে সময়, কমবে ভোগান্তি

দিরাই সংবাদদাতা
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে অনেক প্রতিষ্ঠান সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে বন্যার্ত লোকজন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আর্থিক, খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নেও কাজ করছেন অনেকে। তেমনই একটি বেসরকারি এনজিও প্রতিষ্ঠান উত্তরণ। ক্রিশ্চিয়ান এইড’র সহায়তায় কাঠের তৈরী সেতু বানিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওর জনপদে নানাবিধ সমস্যার অন্যতম হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে নাজুক হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নে দুইটি কাঠের সেতু তৈরীর কাজ শেষ করে চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে।
সোমবার দুপুরে দিরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুর রহমান মামুন ব্রীজ দুটি উদ্বোধন করেন। এসময় উপস্তিত ছিলেন ৬ নং করিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান লিটন চন্দ্র দাস, প্রকল্প পরিচালক ইশরাত জাহান সহ স্থানীয় ইউপি সদস্যরা।
সরজমিনে দেখা গেছে, কালনী নদীর কূল ঘেঁষে চান্দপুর ও টুকদিরাইয়ের খালে নির্মিত হয়েছে ৫৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৮ ফুট প্রস্থের কাঠের সেতু। অন্যদিকে একই পরিমাপে চান্দপুর গ্রামের সাথে রজনীগঞ্জ বাজার সড়কের জয়নগর অংশে আরেকটি সেতু নির্মিত হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ব্রীজ দেখতে আশেপাশের লোকজন জড়ো হচ্ছে প্রতিদিনই। ব্রীজের উপর ছবি তুলছে এলাকার উৎসুক লোকজন। মাত্র ১৫ দিনে দৃষ্টিনন্দন সেতুটি তৈরী হওযাতে অনেকের কাছেই নতুন ও ব্যতিক্রমী মনে হচ্ছে। সেতু দুটি নির্মাণে শুধু মাত্র কাঠ ব্যবহার হয়েছে। ব্রীজ তৈরীর কাঁচামাল স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি ব্রীজের ব্যয় ৫ লক্ষ টাকা। মাত্র ১৫ দিনে তৈরী হয়েছে ব্রীজ দুটি। সেতুর পিলার হিসেবে ছোট ধরনের গাছের মূল ব্যবহার করা হয়েছে। পাটাতন হিসেবে দেয়া হয়েছে কাঠের তক্তা। শক্ত বাঁশ দিয়ে দেয়া হয়েছে রেলিং। হাওরের প্রতিটি খালেই বর্ষা মৌসুমে নৌকা চলাচল করে বিধায় সেদিক বিবেচনায় নিয়ে উচ্চতা দেয়া হয়েছে ১৬ ফুট।
এলাকাবাসী বলছেন, অধিক ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে উত্তরণের কাঠের সেতু খুব উপকারে আসবে। হাওর এলাকার প্রতিটি খাল, গ্রামের সংযোগ স্থলে কাঠের ব্রীজ নির্মাণ করতে পারলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে এবং জনগণ উপকৃত হবে।
কাঠের সেতুর উপরে ছবি তোলাতে ব্যস্ত সংস্কৃতি ও সমাজকর্মী অরন্য কিরণ বলেন, হাওরবাসীর জন্য এটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। প্রায় প্রতিটি জনপদেই এমন কিছু খাল ও নিচু জায়গা রয়েছে। এসব খালের বর্ষায় ও বৃষ্টির দিনে চলাচলে মারাত্মক ভোগান্তির সৃষ্টি হতে হয়। দিরাই ও অন্যান্য এলাকাতে এমন সেতু নির্মাণ করলে ভাল হবে। এতে নির্মাণ খরচ কমবে। প্রয়োজনে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের সুয়োগ থাকবে।
চান্দপুর গ্রামের তপু দাস বলেন, টুকচানপুর খালের উপর ব্রীজটি নির্মাণ হওয়াতে অন্তত কয়েক হাজার মানুষের যাতায়াতে সময় ও ভোগান্তি কমলো। এছাড়াও চানপুর, টুকদিরাই, নাসিরপুর মাটিয়াপুরসহ অন্যান্য গ্রামের শিক্ষার্থীদের চলাচলে সুবিধা হলো। বর্ষা মৌসুমে এই খাল দিয়ে ট্রলার যাতায়াত করে। এছাড়াও বারোমাসেই সাধারণ মানুষের চলাচলের অনুপযোগী ছিল এতদিন। এখন ব্রীজের নিচ দিয়ে ট্রলার, উপর দিয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারবে।
অরুন দাস বলেন, চানপুর গ্রামের দুই প্রান্তে দুটি ছোটখাল। বর্ষা মৌসুমে চলাচলে মারাত্মক অসুবিধায় পড়তে হয়। ব্রীজটি হওয়াতে অন্তত ১০ হাজার মানুষের নিশ্চিত চলাচলের ব্যবস্থা হলো।
কাঠের সেতু নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক ইশরাত জাহান বলেন, বন্যার্তদের সহযোগিতা করতে উত্তরণ এগিয়ে এসেছে। আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এলাকাবাসী ও প্রশাসনের সাথে কথা বলেই আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হওয়াতে আমরা স্থানীয় লেবার দিয়েই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করি। সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হলে সেতু দুটি জনসাধারণের উপকারে আসবে।
এ প্রসঙ্গে করিমপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান লিটন চন্দ্র দাস বলেন, কাঠের সেতু দুটি করিমপুর ইউনিয়নবাসীসহ আশেপাশের এলাকার জনসাধারণের চলাচলে সুবিধা হবে। বন্যার সময় টুকচানপুর খালটির ভাঙ্গা অংশ অধিক গর্ত হয়ে গিয়েছিল। সেতু দিয়ে দুইপাড়কে একত্রিত করা হয়েছে। উত্তরণকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ব্রীজ দুটি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। এর সুফল পেলে অন্যান্য এলাকায় এমন ব্রীজ নির্মাণ করা হবে।