রোমেনা লেইস
নক্ষত্র তারাই যারা আপন আলোয় উদ্ভাসিত। শুধু নিজে আলোকিত, তা নয় আলো বিলিয়েও যান। আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ (সতীশ চন্দ্র উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের) থেকে ৭৫ বছরে অনেক শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। মেয়েরা পড়াশুনা কমপ্লিট করতে না করতেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কেউ কেউ বিখ্যাতদের কাতারে নিজেকে নিয়ে যেতে পারে। আজ আমি সেরকমই বিখ্যাত একজনের কথা লিখছি।
১. ঝর্না দাশ পুরকায়স্থ
সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চল সুখাইরের জমিদার পরিবারে ১৯৪২ সালে জন্ম। বাবা সুধাংশু শেখর চৌধুরী ও মা নীলিমা চৌধুরীর প্রথম সন্তান। সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরে স্টেডিয়ামের দক্ষিণ দিকে তাঁর বাবার বাড়ি। সরকারী এসসি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৫৯ সালে সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে পাশ করেন এইচএসসি। বিএ ক্লাসে ভর্তির কিছুদিনের মধ্যে শৈলেন্দ্র শেখর দাশ পুরকায়স্থর সাথে বিয়ে হয়ে যায়। স্বামীর কর্মস্থল রাজশাহী হওয়ায় সেখানে বাংলা অনার্সে ভর্তি হন। একে একে চার সন্তান আসে তাঁর কোলে। পড়ালেখায় বাধা পড়ে। ১৯৬৮ সালে স্বামীর কর্মস্থল পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৭১ এ যুদ্ধ শুরু হলে তারা সপরিবারে গৃহবন্দি হয়ে পড়েন। বহু কষ্টে কোয়েটা, কান্দাহার, কাবুল হয়ে একমাস পরে ঢাকা এসে পৌঁছান। তাঁর মেঘ জ্যোৎস্নায় মুক্তিযুদ্ধ পড়ে সবাই জানতে পারবে রোমহর্ষক সেই দিনরাতের গল্প। অপর বই বন্দী দিন বন্দী রাত ও উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৩ সালে ফিরে আসেন দেশে। মানুষের ইচ্ছাশক্তি অনেক বড় চালিকা শক্তি। একটু গুছিয়ে নিয়ে ১৯৭৬ এ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্সে নাইট ক্লাসে ভর্তি হন। সমাপনী পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। সে বছর এ বিষয়ে আর কেউ প্রথম শ্রেণী পায়নি। উনার সাথে কথা বলে জেনেছি উনার মৌখিক পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার প্রফেসর আকরাম স্যার বলেছিলেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন পড়েননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে প্রথম শ্রেণী পেতে পারতেন। সংসার সন্তান সামলে পড়াশুনা লেখালেখি চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। কারণ তার স্বামী উৎসাহ যুগিয়েছেন সবসময়। সারাজীবন সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে গেছেন। বাংলাভাষা কে এই উপমহাদেশে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন। ১৯৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রথম স্বরচিত বাংলা কবিতা পড়ে সম্মাননা লাভ করেন। তাঁর রচিত শিশু সাহিত্য মোট বই বের হয়েছে ৩৬ টি। উপন্যাস লিখেছেন ১০ টি।ছোট গল্প লিখেছেন ১৫ টি। তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন নানা সংগঠন থেকে।
প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পদকগুলো হচ্ছে
১. সাজেদুন্নেসা খাতুন চৌধুরী সাহিত্য পদক ১৪০১ বাংলা
২. বাংলাদেশ জাতীয় সাহিত্য পরিষদ ও সমাজ সেবা পদক ১৯৯৪।
৩. বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক ১৯৯৬।
৪. কমর মুশতারী স্মৃতি পুরস্কার ১৯৯৮।
৫. সিলেট লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক ২০০০।
৬. আগুনের ফুলকী শিশু উন্নয়ন পুরস্কার (শিশু সাহিত্য) ১৯৯৯।
৭. রিআ্যাফ সাহিত্য পুরস্কার ২০০২।
৮. আশরাফ সিদ্দিকী ফাউন্ডেশন সাহিত্য পদক ২০০২।
৯. ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি গোষ্ঠি গোল্ড মেডেল পদক ২০০৩।
১০. কবি সংসদ বাংলাদেশ পদক ২০০৮
১১. আলোয় ভূবনভরা বিজয় দিবস সম্মাননা পুরস্কার ২০০৪।
১২. এম নূরুল কাদির শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০০৬
১৩. রাগীব রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার ২০০৬।
১৪. অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৩১৫ বাং
১৫. নন্দিনী সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯।
১৬. অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার।
১৭. লেডিস ক্লাবের ৬১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সম্মাননা ক্রেস্ট লাভ করেন ৪ জুন ২০১৬ তে।
এছাড়াও তিনি আজীবন সদস্য বাংলা একাডেমীর, লেখিকা সংঘ বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ লেখক সংঘের। রেডিও টেলিভিশনের মনোনীত গীতিকার তিনি। বর্ণাঢ্য আলোকময় জীবন। ভারত ও জার্মানী ভ্রমণ করেছেন। সুনামগঞ্জের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আর রাস্তার দুপাশে কচুরীপানার বেগুনী ফুল, সুখাইরের হাওর বাওর দেখে দেখে বড় হয়েছেন বলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন। প্রকৃতি থেকে শিক্ষণীয় কত কিছু ছড়িয়ে আছে। আজকালকার ছেলেমেয়েরা আকাশ দেখতে পায় না। প্রকৃতি মানুষের মনের জগতকে সমৃদ্ধ করে। একজন সাহিত্যসেবী হিসেবে এটা তাঁর বক্তব্য। আমি তাঁর স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সুখী জীবন কামনা করি।


