১০ হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যাপীঠে ছাত্রাবাস নেই

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় বিদ্যপীঠ সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ। শিক্ষার্থীর সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। চার বছর আগেও এই বিদ্যাপীঠের দুটি ছাত্রাবাস ছিল। এখন দুটি ছাত্রীনিবাস আছে। কিন্তু ছাত্রদের থাকার কোন আবাসিক ব্যবস্থা নেই। এ কারণে প্রত্যন্ত হাওর এলাকার শিক্ষার্থীরা আবাসন ভোগান্তিতে রয়েছে। ছাত্রাবাস না থাকায় রাজনৈতিক চর্চা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও কমে গেছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট বোরহান উদ্দিন দোলন বললেন, ৯০’এর গণঅভ্যুত্থানের আগের উত্তাল দিনগুলোতে শহরে পুলিশি বাধা অতিক্রম করে হওয়া সবকয়টি মিছিলেই ছাত্রদের উপস্থিতি ছিল। বিশেষ করে হাছনগরের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা তালেব ছাত্রাবাস (মুসলিম ছাত্রাবাস) এবং উকিলপাড়ার শ্রীকান্ত ছাত্রাবাসের ছাত্র কর্মীরাই মিছিল জমিয়ে রাখতো। ছাত্রাবাসে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, পড়াশুনারও প্রতিযোগিতা ছিল। ওখানে অবস্থান করা ছাত্রনেতারা কলেজের ছাত্রসংসদ নির্বাচনেও অংশ নিয়েছেন। ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্রসংসদ নির্বাচনের প্যানেল করার আগে ছাত্রাবাসের প্রতিনিধি বা হোস্টেলের ‘হিস্যা’ রেখে প্যানেল চূড়ান্ত করতেন। তখন ছাত্র ছিল হাজার- দেড় হাজারের মতো। এখন সরকারি কলেজে প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী। কিন্তু ছাত্রাবাস নেই। রাজনৈতিক কার্যক্রমে ছাত্রদের উপস্থিতিও কমে গেছে। এই অবস্থা চলতে দেওয়া ঠিক হবে না। শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে দরিদ্র ছাত্ররা অপেক্ষাকৃত কম খরচে থাকার ব্যবস্থা করতে ছাত্রাবাসের প্রয়োজন রয়েছে। ছাত্রাবাস হলে রাজনৈতিক কার্যক্রমেও ছাত্রদের উপস্থিতি বাড়বে।
সাবেক ভিপি মনিষ কান্তি দে মিন্টু বললেন, ছাত্র রাজনীতির জৌলুস কমে গেছে। শুদ্ধ চর্চাও হয় না। রাজনৈতিক কার্যক্রমে ছাত্রদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনও হয় না। কে কার দাবি নিয়ে কথা বলবে। দশ বছর আগেও একজন ছাত্র দুই জন ছাত্র পড়িয়ে হোস্টেলে থেকে খরচ চালিয়ে পড়াশুনা করেছে। কলেজের নিজস্ব আবাসিক ব্যবস্থা না থাকায় সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা অধিক খরচ করে ম্যাচ করে বা বাসা ভাড়া করে থাকছে। দিনে পাঁচটা- ছয়টা টিউশনি করতে হচ্ছে তাদের। কেউ এদের খোঁজও রাখে না।
কলেজের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নিমাই সরকার বললেন, শাল্লার প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি আমার। টিউশনি করেই পড়াশুনা করছি। নিজের খরচ চালানোর পাশাপশি পরিবারের খরচ চালাতেও বাড়িতে টাকা দিতে হচ্ছে। ছাত্রাবাস থাকলে খরচ কম হতো। একটি টিউশনি কম করে নিজের পড়াশুনায় সময় বাড়ানো যেত।
জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি দীপংকর কান্তি দে বললেন, ছাত্রাবাসের দাবি জানিয়ে উর্ধ্বতনদের স্মারকলিপি দিয়েছি। মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রীর নিকটও এই বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছি। একই কথা জানালেন, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান রিপন।
সরকারি দলের এই ছাত্র সংগঠনের সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে কমিটি নেই। সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বললেন, শীগগিরই কলেজে সংগঠনের কমিটি হবে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বললেন, আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সাঈদুর রহমান আসাদ বললেন, জেলার প্রধান বিদ্যাপীঠ এটি। এখানকার অনেক শিক্ষার্থীরই প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি। একসময় শিক্ষার্থীরা জায়গির থাকতে পারতো। এখন জায়গির রাখা বা থাকা’র প্রবণতা কমে গেছে। ছাত্রাবাসও নেই। এ কারণে দরিদ্র ছাত্ররা বেশি বেকায়দায় পড়েছে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রজত সোম মানস বললেন, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে দুটি ছাত্রীনিবাস ইতিপূর্বে করা হয়েছে। একটি পাঁচ তলা বিশিষ্ট শেখ ফজিলাতুনন্নেছা মুজিব ছাত্রী নিবাস, আরেকটি তিন তলার বেগম রোকেয়া ছাত্রী নিবাস। সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চলের জেলা এখানে ছাত্রবাসের প্রয়োজন আছে। আমি তিন মাস হয় দায়িত্বে নিয়েছি। আমার আগে যারা কাজ করেছেন, তারা ছাত্রাবাসের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামছুল আরেফিন খান বললেন, ২০১৯ সালে কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্রাবাসের জন্য আবেদন করেছিলেন। আমরা এটি অগ্রবর্তী করেছি। এরপর আর কোন অগ্রগতি নেই।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের শহীদ তালেব ছাত্রাবাস (মুসলিম ছাত্রাবাস) ৫০ বছরের পুরনো ছাত্রাবাস ছিল। এটি বর্তমানে ছাত্রীনিবাস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া শহরের উকিলপাড়ায় অবস্থিত সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের কৃষ্ণচন্দ্র স্মৃতি ছাত্রাবাস (হিন্দু হোস্টেল)। যা দীর্ঘদিন হয় ব্যবহারের অনুপযোগী। কর্তৃপক্ষ এটি বন্ধ রেখেছেন।