শুভ বিদায় ২০২২

সময় গণনার আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণীয় একটি রীতি খ্রিস্টিয় ২০২২ সনের আজ শেষ দিন। ঘটনাবহুল এই বছরের বিদায়ক্ষণে পুরো বছরের নানা দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে উঠে। নানা ঘটনা, দুর্ঘটনা, সম্ভাবনা, প্রাপ্তি এবং হতাশায় ঠাসা ছিলো এই বছরটি। স্থানীয়, জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক; সব পর্যায়েই ছিলো এমন বাস্তবতা। সময় নিজে নিজে কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সময় তৈরিও করে না কিছু। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে যে মানবসমাজের বসবাস তারাই হন নায়ক বা প্রতিনায়ক অথবা খলনায়ক। এর বাইরে আরেক মহানায়ক হল রহস্যময় প্রকৃতি। এইসব নায়কদের কারণে তৈরি হয় বিশেষ সময়ের ঘটনাপুঞ্জ। তাই সময়ের হিসাব যখন আমরা মিলাতে বসি তখন মূলত ওই সময়ে প্রভাবক হিসাবে বিবেচিত মানুষ ও প্রকৃতির অবদানকেই আমরা মূল্যায়নে আনি।
আজকের বিষাদ বিকেলে যে ম্লান সূর্য পশ্চিমাকাশে অস্ত যেয়ে পরদিন নতুন প্রভাতের সূচনা ঘটাবে সেটি হবে আরেকটি নতুন বছর, হিসাব কষার সূচনালগ্ন। বিদায়ী ২০২২ খ্রিস্টিয় সনটি আমাদের হাওরের কোলে জেগে থাকা ভাটি জনপদটি বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছিলো প্রলয়ংকরী বন্যার ভয়াবহতায়। বন্যার অল্প আগে আগাম বন্যায় তলিয়ে যায় বোরো ফসলের ক্ষেত। মূলত এই দুই প্রাকৃতিক অভিঘাতে ভাটির মানুষের কোমর ভেঙে দিয়েছে। প্রকৃতির এই বিধ্বংসীলীলার জন্য মানুষেরই অবিমৃষ্যকারিতা দায়ী। আমরা নিজেদের অন্যায় অপকর্ম ঢাকতে সব দোষ চাপিয়ে দেই প্রকৃতির উপর। অথচ প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান করে সমাধানসূত্র বের করার দিকে মনোযোগী হলেই মানুষের দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণ নিশ্চিত করা যেত। এই বছরে জেলার তথা সিলেট বিভাগের সবচাইতে বড় সেতু রানীগঞ্জের কুশিয়ারা সেতু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সংযোগ সড়ক ও অন্য দুইটি বিধ্বস্ত সেতুর কারণে এখন পর্যন্ত এর সুফল পাচ্ছি না আমরা। এবছর সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদায়নের মধ্য দিয়ে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির দুয়ার খোলা হয়েছে। স্থান নির্বাচনের কাজটিও চূড়ান্ত করা গেছে এ বছর। এছাড়া বেশ কযেকজন গুণী ব্যক্তিকে হারিয়েছি আমরা।
জাতীয়ভাবে বেশকিছু মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার মাধ্যমে ব্যবহারিক পর্যায়ে আসাটা ছিলো উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক অর্জন। পদ্মা সেতু, চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু টানেল, রাজধানীর মেট্রোরেল; প্রভৃতি ছিলো অন্যতম। রাজনৈতিক অঙ্গন ছিলো ঘটনাবহুল যার রেশ বছরের শেষ ভাগে এসে আরও ঘটনাবহুল ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবাহী হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের দীর্ঘদিনের অবসন্নতা কাটিয়ে জেগে উঠার বছর হিসাবে বিবেচনা করা যায় ২০২২ সনকে। বিএনপি’র বেশ কয়েকটি সফল কর্মসূচী এর প্রমাণ। গতকাল বিএনপি ও এর মিত্রজোটগুলো গণমিছিলের মধ্য দিয়ে তাদের অবস্থান জানানোর চেষ্টায় অবিচল ছিলো। অন্যদিকে আওয়ামী লীগও এবছরের শেষভাগে এসে ব্যাপকভাবে বেশকিছু জনসম্পৃক্ত সফল রাজনৈতিক কর্মসূচী আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিজেদের মুখ্য অবস্থানের প্রমাণ রেখেছে। মূলত এসব রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে দেশের বিভেদ, বিভাজন ও পারষ্পরিক অবিশ্বাসের জায়গায় কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা দেয়নি। হতাশার জায়গা এটুকো। সামনের বছরটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অতিমাত্রায় চ্যালেঞ্জের। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। এই জায়গায় রাজনৈতিক দলগুলো কতটা দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতা দেখাতে পারে তা দেখার বিষয়।
আন্তর্জাতিক পরিসরে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বৈশ্বিক প্রভাববলয়ের নতুন মেরুকরণের উপলক্ষ হয়ে উঠা এই যুদ্ধ এখন পুরো বিশ্ববাসীর জন্য হয়ে উঠেছে অতিমাত্রায় ক্ষতি ও উদ্বেগের। যুদ্ধ নয় শান্তি চাই এমন প্রত্যাশা সাধারণ বিশ্ববাসীর। কিন্তু অমীমাংসিত এই যুদ্ধ ব্যাপক জনপ্রত্যাশার এই জায়গাটিকে কোনোরূপ গুরুত্ব না দিয়ে অব্যাহতভাবে আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। এই জায়গায় বিশ্ববাসীর দায়িত্ব হলো এরূপ আধিপত্যবিস্তারী সা¤্রাজ্যবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে নতুন জাগরণ তৈরি করা।
২০২৩ সনে এক সম্ভাবনাময় শান্তির পৃথিবী ও স্বদেশ দেখার ইচ্ছা আমাদের। শুভ বিদায় ২০২২।