রাজনৈতিক পরিশুদ্ধতা অর্জনের প্রক্রিয়া তবে শুরু হোক

রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তাদের নেতৃত্বের গুণাবলী প্রকাশিত হয় রাষ্ট্রীয় চরিত্রের পরতে পরতে। তাই রাজনীতিতে ভালো ও ত্যাগী নেতৃত্বের আকাক্সক্ষা সর্বকালীন ও সর্বজনীন। একসময় রাজনীতিতে এরকম ত্যাগী নেতৃত্বের গুরুত্ব ও প্রভাব ছিলো অনস্বীকার্য। সেই ব্রিটিশ শাসনামল থেকে পাকিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ভাগ পর্যন্ত বহু নেতা নিজের ত্যাগ, আদর্শ ও দক্ষতা দিয়ে রাজনীতি ও স্বদেশকে উজ্জ্বল করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনীতি, ক্ষমতা ও ব্যবসায়কে যখন থেকে এক কাতারে নিয়ে আসার সর্বনাশা প্রবণতা শুরু হয় তখন থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্বে আগের সুগুণাবলী সম্পন্ন নেতা-কর্মীদের কদর কমতে থাকে। তৎস্থানে জায়গা করে নিতে থাকে অসৎ ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক আমলা, মাস্তান, খল প্রভৃতি ব্যক্তিরা। এদের দাপটে আদর্শবান ব্যক্তিরা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে উঠেছেন। এখন তাই আর কোনো ভালো মানুষ বা মেধাবী ব্যক্তি রাজনীতিতে জড়িত হতে চান না। এর ফল হয়েছে রাজনীতি ও অসৎ উপার্জন একই বন্ধনীর ভিতরে ঠাই করে নেয়া। এরকম আক্ষেপোক্তিই ফুটে উঠেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কণ্ঠে। রোববার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে জাতীয় পার্টি-জেপির ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে ভালো মানুষ আসতে চান না। আমরা রাজনীতিকরা রাজনীতিকে ভালো মানুষের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে পারিনি। আমরা যারা রাজনীতি করি, এই ব্যর্থতার দায় আমাদেরই।’ প্রবীণ এই অভিজ্ঞ রাজনীতিকের এমন উপলব্ধি ইতিবাচক। তবে রাজনীতিকে ভালো মানুষের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলার বিষয়ে বড় দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে সংশয় ঠিক আগের মতোই থেকে যাবে যদি না দলগুলো দৃশ্যমান কোনো সংস্কৃতি তৈরি না করতে পারে।
রাজনীতির হাতেখড়ির জায়গা হলো ছাত্র রাজনীতি। গত কয়েক দশক ধরে দেশে সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতি নেই। যা আছে তা অন্ধ দলীয় লেজুড়বৃত্তি, নেতা তোষণ, ব্যবসায়িক কর্মকা-ে অধিক আগ্রহ, চাঁদাবাজি, শক্তি প্রদর্শন প্রভৃতি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য দ্বারা আক্রান্ত। এরকম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতির ভার গ্রহণের মতো যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হয় না। এরই প্রতিফলন দেখা যায় গত অন্তত দুই দশক যাবৎ প্রধান ছাত্র সংগঠনগুলোর মূল নেতৃত্বের জাতীয় রাজনীতিতে ভালো পদ-পদবীতে না আসার মধ্য দিয়ে। ক্ষমতাসীন বা প্রধান বিরোধী দল উভয় ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য।
মূলত দেশপ্রেম ও আদর্শনিষ্ঠার জায়গায় এক চরম সংকটময় সময় অতিক্রম করছি আমরা। কেউই ব্যক্তি বুহ্যের উর্দ্ধে উঠে সকলের কথা ভাববার জায়গায় যেতে চায় না। রাজনীতি করার অর্থ এখন হয়ে গেছে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়া। তাই একসময় রাজনীতি করে সম্পদ হারানোর যে দৃষ্টান্ত ছিলো তা এখন তিরোহিত হয়ে গেছে। এখন রাজনীতিতে আসলেই আলাদীনের দৈত্য এসে বিপুল ধনসম্পত্তির মালিক করে দেয়। যেকোনো প্রকারে ক্ষমতায় থাকার যে অসুস্থ সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিকে গ্রাস করেছে সেই জায়গা থেকে সুন্দর-শোভন রাজনীতি পেতে হলে শুধু কথার খই ফোটালে চলবে না, দরকার ব্যাপক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করা। সেই কাজ কি রাজনীতিবিদরা করবেন? আপাতত সে আশা নিরাশার মতোই মনে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার অন্য কোনো বিকল্প নেই। কোনো এক জায়গা থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের আত্মোপলব্ধিকে যদি আমরা রাজনীতির মোড় ফিরানোর যাত্রাপথে সুস্থতা চর্চার শুরু হিসাবে দেখতে পারি তবে তা হবে অসাধারণ এক প্রাপ্তি। আমরা বিশ্বাস করি, কেবল রাজনৈতিক পরিশুদ্ধতা অর্জনের মধ্য দিয়েই অল্প সময়ে সম্ভাবনাময় এই প্রাচুর্যে ভরা দেশটি সারা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে সদর্পে দাঁড়িয়ে যেতে পারবে।