শ্রমিকদের আইন নির্ধারিত সুযোগ নিশ্চিত করা হোক

যেকোনো উৎসব উপলক্ষে শ্রমিকদের শ্রম আইন অনুযায়ী সবেতনে ১১ দিন ছুটি পাওয়ার বিধান রয়েছে। এছাড়াও সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া অর্জিত ছুটি, চিকিৎসা ছুটি, নৈমিত্তিক ছুটিসহ প্রায় ৫৫ দিনের মতো ছুটি ভোগ করার অধিকার আছে শ্রমিকদের। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকরা আইনে প্রদত্ত এসব ছুটি কখনও ভোগ করতে পারেন না। এমনকি ৮ শ্রমঘণ্টার অতিরিক্ত সময়ে কাজ করার জন্য যে ওভারটাইম পাওয়ার কথা তাও অনেক শ্রমিক পান না। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে গতকাল প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলার স—মিল শ্রমিকরা আসন্ন ঈদোৎসবে সবেতনে ছুটি ও উৎসবভাতা পাওয়ার জন্য মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। শুধু স—মিল শ্রমিকরাই নয় অপ্রাতিষ্ঠানিক বহু খাতের শ্রমিকরাই এমন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এসব সেক্টরে কাজ করতে যেয়ে অসুস্থ বা আহত হলেও শ্রমিকরা মালিকদের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা বা বেতনসহ ছুটি পান না। এই ধরনের অমানবিক ব্যবস্থার অবসান ঘটা উচিৎ।
শ্রমসংশ্লিষ্ট যেকোনো কল—কারখানার প্রাণ হলো নিয়োজিত শ্রমিকরা। ঘাম ঝরানো প্ররিশ্রম করে শ্রমিকরা চালু রাখেন এসব কল—কারখানা। শিল্পের প্রাণভোমরা এসব শ্রমিকদের জীবন হয়ে থাকে বাতির নীচে অন্ধকারের মতো। সরকার আইন করে যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা দিতে মালিকরা নানা ওজর আপত্তি সামনে নিয়ে আসেন। প্রায়শই মালিকদের এমন আপত্তি অযৌক্তিক। শ্রমিকদের শ্রমের ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে মালিকরা প্রচুর মুনাফা তুলে নেন। এর ন্যায্য হিস্যা দেয়া হয় না শ্রমিকদের। এ কারণে শ্রমিকরা অপুষ্টিতে ভোগে, চিকিৎসার অভাবে, মানসম্মত জীবন ধারণের সুযোগ না পেয়ে পরিণত বয়সের আগেই শ্রম দেয়ার ক্ষমতা হারান। বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত আইন নির্ধারিত মজুরি ও সুযোগ সুবিধা প্রদানের জন্য নানাভাবে মালিক ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চললেও তাতে খুব বেশি ফল আসে না।
মালিক—শ্রমিক কখনও একে অপরের প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা নয়। উভয় পক্ষ মিলেই তৈরি হয় উৎপাদন—পরিবেশ। মালিক বা উদ্যোক্তা শ্রেণি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না করলে শ্রমিকরা শ্রম দেয়ার ক্ষেত্র পাবেন না। এতে তৈরি হবে চরম বেকারত্ব। অন্যদিকে শ্রমিক না থাকলে এসব কল—কারখানার উৎপাদনযন্ত্র সচল হতে পারবে না কখনও। বাংলাদেশে এখন একটি প্রতিশ্রম্নতিশীল উদ্যোক্তাগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়েছে। এখন যদি এই জায়গায় মালিক—শ্রমিক উভয় পক্ষ পারষ্পরিক সুসম্পর্কের ভিত্তিতে যার যতটুকু পাওনা তা দেয়ার মতো একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হত তা হলে সার্বিক উৎপাদনশীলতা নিঃসন্দেহে অনেক বেড়ে যেত। অন্যদিকে মানসম্মত জীবন ধারণের মধ্য দিয়ে শ্রমিক সমাজও সন্তুষ্ট থাকতেন। কিন্তু কার্যত মালিক পক্ষের অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের বাসনার কারণে বাংলাদেশে সেই সুসম্পর্ক তেমন একটা দেখা যায় না। এখানে মালিকপক্ষ যতটা পারেন শ্রমিকদের শোষণ করার প্রক্রিয়া বজায় রাখার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকেন। এতে শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হয় তীব্র অসন্তোষ।
পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ বা অন্যান্য উৎসব পালন করা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার। মানবাধিকারের একেবারে মৌলিক দিক এটি। কিন্তু যখন উৎসব পালন করতে বেতন ও উৎসব ভাতা দেয়ার জন্য শ্রমিকদের দাবি জানাতে হয় তখন তা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হয়ে উঠে। এই অধিকার কারও দয়া দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়। এগুলো আইন নির্ধারিত অধিকার। এবং শ্রম অধিদদপ্তর নামের প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো সকল সেক্টরে এই অধিকার বাস্তবায়ন করার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সুনামগঞ্জের স—মিল শ্রমিকরা সভার মাধ্যমে যে দাবি জানিয়েছেন, এবং একইরকম বাস্তবতা আরও যে যে সেক্টরে বিরাজমান; আমরা চাই সেসব জায়গায় মালিকপক্ষ আইন অনুসরণ করে ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করবেন এবং তাদের উৎসব ছুটি সবেতনে মঞ্জুর করবেন।