মহালয়ায় দেবী বোধনের মধ্য দিয়ে দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও মূল উৎসব শুরু হচ্ছে আজ মহা সপ্তমী তিথি থেকে। দশমী তিথিতে দেবী বিষর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এই উৎসব। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে দেবতাদের শত্রু মহিষাসুর নামক মহা পরাক্রমশালী অসুরকে বিনাশের জন্য দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটেছিল। তাই দেবী দুর্গাকে অশুভ শক্তির নাশক ও শুভ শক্তির রক্ষক রূপে পূজা করা হয়। বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব এই দুর্গা পূজা। এটি সার্বজনীন উৎসব। এখানে যাবতীয় ভেদাভেদ ভুলে এক ম-পে ভক্তবৃন্দ সমবেত হন মাতৃ আরাধনায়। দুর্গা পূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও উৎসবপ্রিয় বাঙালিরা এটিকে সার্বজনিন উৎসবে পরিণত করেছেন। শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠানাদি ব্যতিত পূজাকে ঘিরে এই পাঁচ দিন ম-পে ম-পে যেসব আনন্দ আয়োজন ও উৎসবমুখরতা থাকবে সেখানে যোগ দিবেন সকল ধর্মাবলম্বীরা। অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনা থেকে উৎসারিত ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এই শ্লোগানের স্বার্থক প্রতিচ্ছবি দুর্গা পূজার সার্বজনিন ম-পগুলো। তাই দুর্গা পূজা ধর্মীয় চরিত্রের বাইরে গিয়েও এক সামাজিক বন্ধনের অনুপম চিত্র হয়ে ফুটে আছে আমাদের দেশে। এরকম ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থবহ উৎসব উপলক্ষে আমরা সকলকে জানাই শারদীয় প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
পৃথিবীজুরে আজ অশুভ শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্মীয় উগ্রবাদ আজ সারা বিশ্বের শুভ ও সুন্দরের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি কোণে আজ অশান্তির দাবানল, যুদ্ধের হুংকার, ভ্রাতৃহত্যার পৈশাচিকতা, রক্তের হুলিখেলা। এই অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ একাট্টা। কিন্তু অসুন্দরের পূজারীরা আড়ালে থেকে নিজেদের যে পৈশাচিকতা দেখিয়ে চলেছে তা আমাদের আতংকিত করে তুলেছে। এরকম অবস্থায় অশুভ শক্তির নাশকারী দেবী দুর্গার কাছে ভক্তবৃন্দ নিশ্চয়ই সমকালীন অসুরদের বিনাশ কামনা করবেন।
সরকার দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে চলেছেন। দুর্গা পূজায় যাতে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেজন্য সবধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন প্রশাসন। পূজারীদেরও এ বিষয়ে সবিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। পূজাম-পগুলোতে কিংবা পূজাকে উপলক্ষ করে এক শ্রেণির উশৃঙ্খল তরুণ মদ্য পান, অশালীন আচরণ, ইভটিজিং, চুরি-ছিনতাই এমন প্রক্রিয়ায় জড়িত হয়ে পড়ে বলে অতীত অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি। পূজা কমিটিগুলোর স্বেচ্ছাসেবকদের এ বিষয়ে সবিশেষ নজরদারি রাখতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহায়তা নিয়ে এরকম কুপ্রবৃত্তিকে রুখে দিতে হবে।
পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য মতে জেলায় এবার ৩৫১ টি ম-পে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সবগুলো পূজা ম-প পূজার পাঁচ দিন যাবতীয় উৎসব মুখরতায় ভরপুর থাকবে, এটাই আমাদের কামনা। সরকার পূজা আয়োজকদের সাথে আলোচনা করে যেসব অনুসরণীয় বিষয়াদি নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেগুলো সকলে যথাযথভাবে পালন করবেন বলে আশা করি আমরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আমাদের অনুরোধ, সন্ধ্যার পর দর্শনার্থীদের বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের নিরাপত্তার দিকে আপনারা বিশেষ ভাবে নজর রাখবেন। বাংলাদেশে হিন্দু মুসলমানরা ঐতিহাসিক কাল থেকে পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছেন। এই সহাবস্থানের মূল শর্ত হলো পারষ্পরিক আস্থা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও দায়িত্বশীলতা। ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের মানুষ সবসময় অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু রাজনৈতিক উগ্রবাদীতার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে কিংবা সম্পদ দখলীকরণের অশুভ প্রক্রিয়ার কারণে অতীতে বহুবার এই সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়েছে। এবারের শারদীয় দুর্গাপূজার মিলনোৎসবকে সামনে রেখে আমরা আবহমানকালের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অটুট বন্ধনের প্রত্যাশা করি।

