রাজনৈতিকভাবে প্রচ- বিরোধ থাকলেও অনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে যে অলিখিত সমঝোতা রয়েছে তা আমরা বিভিন্ন ঘটনা থেকে বেশ বুঝতে পারি। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী থেকে কয়লা পরিবহনকারী নৌকা বা জলযানগুলো নদীপথে ব্যাপক চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে। ডাম্পেরবাজার থেকে সুলেমানপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার পথ যেতে তিন দফায় চাঁদা দিতে হয়। এর কিছু ইজারা গ্রহণের নামে এবং কিছু ইউনিয়ন পরিষদের নামে। বলাবাহুল্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ইজারাদারদের যে পরিমাণ টুল নেয়ার কথা বাস্তবে এর চাইতে বহু গুণ বেশি চাঁদা আদায় করা হয়ে থাকে। এবং দাবি মোতাবেক চাঁদা পরিশোধে জলযানগুলোকে রীতিমতো বাধ্য করা হয়। প্রয়োজনে শারীরিক শক্তিরও প্রয়োগ হয়ে থাকে।এই পথে টুল আদায়ের নামে যা হচ্ছে তাকে নিছক চাঁদাবাজি বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আলোচ্য সংবাদভাষ্য অনুসারে উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর বাজার ঘাটের ইজারা এনেছেন উপজেলা যুব লীগের আহ্বায়ক। ডাম্পের বাজার ঘাট ইজারা নিয়েছেন উপজেলা যুব দলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদধারী এক নেতা। এছাড়া উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের নামেও জলযান থেকে চাঁদা নেয়া হয়। বলাবাহুল্য নির্ধারিত পরিমাণের চাইতে বেশি টাকা নেয়ার বিষয়ে এই ইজারাদার বা ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। বরং তারা সকলেই এখানে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, যে যেভাবে পারেন সেভাবেই যথেচ্ছ পরিমাণ টাকা তুলে নিবেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরোধ থাকলেও বিবদমান দুই দলের অন্তত দুই নেতার মধ্যে নদীপথে চাঁদাবাজি নিয়ে কোনো বিরোধ নেই।
সুনামগঞ্জ থেকে কয়লা, পাথর ও বালু সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। জেলার অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হলো এই খাতগুলো। তাহিরপুরের বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলীতে সরকার আমদানি রফতানির সুবিধার জন্য স্থলবন্দর করে দিয়েছেন। স্থলবন্দরে আমদানি রফতানির সময় নির্ধারিত হারে শুল্ক পরিশোধ করার পর পরিবহনকালীন নদীপথের বিভিন্ন জায়গায় টুল আদায়ের আইনি ভিত্তি নিয়ে কেউ কখনও প্রশ্ন তোলেননি। ফলে অবাধে অসংখ্য জায়গার এরকম চাঁদাবাজি চলছে। নিয়ম অনুসারে নদীপথে যাতায়াতকারী কোনো যানবাহন যদি কোথাও নোঙর না করে তাহলে চলন্ত যান থেকে কোনো জায়গায় টুল আদায় করার কথা নয়। কিন্তু আমরা দেখেছি জলযানগুলো কোথাও নোঙর করুক কিংবা নাই করুক নির্দিষ্ট পয়েন্ট অতিক্রমের সময় তাদের টুলের নামে চাঁদা দিতে হয়। এতে বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে জেলার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। বর্ণিত সংবাদে কয়েকজন পরিবহনকারী এই চাঁদাবাজির অত্যাচারের কথা সখেদে জানিয়েছেন। বলা অবান্তর যে এরকম খেদোক্তি নিয়মিতই প্রকাশিত হতে দেখা যায়। অতীতে এ নিয়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল,স্মারকলিপি প্রদানের মতো ঘটনাও ঘটেছে এবং এসব সংবাদ যথারীতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এমন বেপরোয়া চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। তথাকথিত ইজারা এনে ইজারাদাররা যেন যেমন খুশি তেমন টাকা তোলার অনাপত্তিপত্র পেয়ে গেছেন। এরকম অব্যবস্থাপনা ও সীমাহীন দৌরাত্ম্য কাম্য না হলেও এটিই এখন একমাত্র সত্য।
ব্যবসা বাণিজ্যকে সুসংহত করার পূর্বশর্ত হলো উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু নানা জায়গায় যদি বেপরোয়া চাঁদা আদায় কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয় তাহলে নিশ্চয়ই তাকে ব্যবসার উপযুক্ত পরিবেশ বলার সুযোগ নেই। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে বাধ্য। এই যে পথে পথে চাাঁদাবাজি হয় শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে ভোক্তাদের ঘাড়ে পড়ে। এসব জিনিসের দাম বাড়ার একটি বড় কারণ এই চাঁদাবাজি। তাই জেলার অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ এই জেলার নদীপথগুলোকে বেপরোয়া চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা করুন।


