ধানকাটা/নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন হাজারো জিরাতি

মো. ওয়ালী উল্লাহ সরকার, জামালগঞ্জ
বিস্তৃর্ণ হাওরের বুকে ফসল ফলাতে বছরের ছয় মাস হাওরে থাকেন জিরাতিরা (ভাসমান কৃষক)। ছাপড়া ঘর তৈরি করে বাস করেন হাওরেই। প্রতিবছরই ঝড়বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাথায় নিয়ে ফসল ফলান। বংশ পরষ্পরায় এ কাজ করে আসছেন তারা। এখন সোনার ফসল ঘরে তুলতে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের।
জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নে হালির হাওরের রাইংগার কান্দায় মরা নদী দুই পাশে ছোট ছোট অর্ধশতাধিক ছাপড়া ঘর। বোরো মৌসুমে ছয় মাস হাওরের মাঝে ছাপড়া ঘরে সংসার পাতেন জিরাতিরা। আশেপাশের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে নেই গাছপালা বা কোন গ্রাম। এখানে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন অথবা রাতে ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। তবুও সব কষ্ট সহ্য করে জিরাতিরা সোনালী ফসল তোলার স্বপ্নে বিভোর থাকেন। ফসল ভালো হলে, ভুলে যান ছয় মাসের কষ্টের কথা। আবার স্বপ্ন বুনেন পরের বছরের জন্য। যুগের পর যুগ এভাবেই চলছে তাদের জীবন। বাপ-দাদার আমল থেকে এভাবেই জীবন বাজী করছেন কৃষি কাজ।
জিরাতিরা জানান, শত বছর আগে এই স্থানেই ছিল তাদের গ্রাম। হাওরের মাঝে গ্রাম হওয়ায় প্রচন্ড ঢেউয়ে গ্রামটি বিলীন হয়ে যায়। তখন থেকেই তারা আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। হারিয়ে যাওয়া গ্রামটির কয়েকশত পরিবারের জমি রয়েছে রাইংগার হাওরে। কার্তিক মাস থেকে ফসল তোলার আগ পর্যন্ত অস্থায়ী ছাপড়া ঘর তৈরি করে ছয় মাস এখানে থাকেন তারা। সঙ্গে নিয়ে আসেন কৃষি সরঞ্জামাদি, হালের গরু সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে ফসল ফলাতে দিন-রাত করেন কঠোর পরিশ্রম।


জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে উত্তর কামলাবাজ, ধানুয়াখালী, ও লম্বাবাক গ্রামের সাইফুল ইসলাম, আলি আহমদ, নুর মোহাম্মদ, কৃষাণী কল্পনা বেগম ও নবী হোসেন জানালেন, জিরাতিদের জীবন অনেক কষ্টের। পরিবার পরিজন নিয়ে ছয় মাস হাওরে ছাপড়া ঘরে গরু, ছাগল ও মানুষ একসাথে গাদাগাদি করে থাকা। খাবার পানি অনেক দূর থেকে আনতে হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য অনুগ্রহ করে পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ধরে রাখতে রাইংগা গ্রামে আবারও মাটি ভরাট কওে গ্রাম গড়ে তুললে ওখানেই ফিরে আসতেন তারা । ঝড় বৃষ্টি ও বজ্রপাতের ভয়ে রাত কাটাতে হতো না। রাইংগার মাঝ দিয়ে যাওয়া মরা খাল খনন করলেই এই মাটি দিয়ে এখানে গ্রাম গড়ে ওঠতো। গেলবছর জিরাতি নবী হোসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পানি সংকটের কথা জানালে- উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আল-আজাদ উপজেলা পরিষদ থেকে একটি টিউবওয়েল দেন। এবারও একটি টিউবওয়েল দিয়েছেন বেহেলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত। এখানে আর কয়েকটি টিউবওয়েলের প্রয়োজনীয়তার কথা জানালেন জিরাতিরা।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ বলেন, সোনালী ফসল ফলাতে বছরের ছয় মাস জিরাতিরা হাওরে ছাপরা ঘরে কষ্ট করে থাকেন। গেলবছর তাদের একটি টিউবওয়েল দিয়েছি। আমি তাদের পূর্ব পুরুষদের সাবেক গ্রামটিতে মাটি ভরাট করে দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য সহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।