সজীব দে
গত দুই বছর যাবত সুনামগঞ্জে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০২১ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিল মাত্র ৩০ জন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০৮ জনে। এবার অনুপস্থিতির সংখ্যা কিছুটা কমলেও অনুপস্থিত রয়েছে ৩৪৩ জন শিক্ষার্থী।
জানা যায়, গতবছর ভয়াবহ বন্যার রেশ থাকায় এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিতির সংখ্যয় রেকর্ড হয়েছিল। তবে এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য কোন বিঘ্ন না থাকলেও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। প্রাথমিক ভাবে বাল্যবিবাহ, অভিভাবকদের অসেচতনতা, পড়াশোনা ছেড়ে চাকুরিতে যোগদান সহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষর্থী ঝরে পড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন- এতো সংখ্যক শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি বিষয় আমাদের জন্য শঙ্কার। অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের শিক্ষা ও কল্যাণ শাখা সূত্রে জানা যায়, এবার সুনামগঞ্জ জেলার ৫৫টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় বসছে ২৮ হাজার ৩৫৩ জন পরীক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ১৪৮ জন। গত বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২৮ হাজার ২০৫ জন। এবার সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২৩ হাজার ২১৮ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় ৪ হাজার ৫৮ জন এবং কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এসএসসি/দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষায় ১ হাজার ৭৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসেছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমানের প্রথম দিনের বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষায় ১৯ হাজার ৯০২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছে ১৯ হাজার ৬৮৪ জন। অনুপস্থিত ২১৮ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল কোরআন মাজিদ তাজভিদ পরীক্ষায় ৩ হাজার ৯১০ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিল ৩ হাজার ৬০২ জন। অনুপস্থিত ১০৮ জন। এসএসসি/দাখিল ভোকেশনাল বাংলা ২য় পত্র পরীক্ষায় ৯৭৫ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিল ৯৫৮ জন। অনুপস্থিত ১৭ জন।
সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক অনুপ নারায়ণ তালুকদার বলেন, জুবিলী কেন্দ্রে ২১জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। ১২৭৬ জনের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১২৫৫ জন। আমার জানা মতে, একজন শিক্ষার্থী অসুস্থতার জন্য পরীক্ষা দিতে পারেনি। অন্যদের বিষয়ে তাৎক্ষণিক জানা যায়নি।
এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইনছান মিঞা বলেন, এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, আমবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় ও শান্তিগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। ১০ জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। ৪৮৮ জনের মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছে ৪৭৮ জন। তিনি বলেন, অনেক মেয়েদের হয়তো বিয়ে শাদি হয়ে গেছে, ছেলেরাও কোন কাজে যোগ দিয়ে থাকতে পারে।
পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব সৈয়দ রমিজ উদ্দিন বলেন, আমার কেন্দ্রে ৭ জন শিক্ষার্থী পারীক্ষায় অংশ নেয় নি। ৬২১ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৬১৪ জন। আমার মনে হয় এরা ড্রপ আউট হয়ে গেছে। তবে খোঁজ খবর নিলে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবি’র সভাপতি অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বলেন, এতো শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতিতে আমরা গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন। ১০ বছর সাফল্যের সাথে লেখাপড়া সম্পন্ন করে যখন কোন শিক্ষার্থী তার জীবনের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে, তখন বুঝতে হবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়ায় গলদ রয়েছে। এবারের মতো অনুকূল আবহাওয়াও শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিত থাকার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা উচিত। অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে হাওর অঞ্চলে শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা বুমেরাং হবে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বলেন, বিষয়টি জেনে আমি হতভম্ব হয়েছি। এতো সংখ্যক শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি সুনামগঞ্জের জন্য খুবই উদ্বেগজনক বিষয়। কী কারণে এতো সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি তার কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
অনুপস্থিতির কারণ সম্পর্কে জেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কিছু বাল্যবিবাহ আছে, অনেকেই লেখাপড়া ছেড়ে চাকরি করছে, অনেকের পিতামাতা ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে অসেচেতন। এছাড়াও দূরের শিক্ষার্থী হয়তো সময় মতো পৌঁছতে পারেনি।
তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের প্রেক্ষাপটে এটা তেমন বেশী না। অনুপস্থিতির সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর এক শতাংশও নয়। যেটা ১ শতাংশও পড়ে না, তা আমরা আমলে নেই না।


