বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু (পূর্ব প্রকাশের পর)
আমেরিকা আসার পর থেকেই আমেরিকান নেটিভদের দেখার খুব ইচ্ছা আমার। এ দেশটি হচ্ছে অভিবাসিদের দেশ। তবে এক সময় এখানে আদি আমেরিকানরা থাকত। যাদের আমরা রেড ইন্ডিয়ান বলে জানি। আসলে রেড ইন্ডিয়ান নামটা এসেছে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর। স্পেনের রানী ইসাবেলা ভারতবর্ষে যাওয়ার জন্য পথ খুঁজছিলেন। এক সময় ভারতবর্ষই ছিল সুখী, সমৃদ্ধশালী দেশ। রাণী ইসাবেলার আহবানে ইটালিয়ান নাবিক কলম্বাস ভারতবর্ষ যাওয়ার পথ বের করতে সহায়তা চাইলে রানী তাকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করেন। কলম্বাস আটলান্টিক মহাসাগরে জাহাজ ভাসিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু তিনি ভারতবর্ষে যেতে পারেননি। একসময় তিনি আমেরিকার পাশে বাহামা দ্বীপপুঞ্জে তার জাহাজ নোঙ্গর করেন। সেখানেই যাদের সাথে দেখা হয় তারাই ছিলেন আমেরিকান আদিবাসি। কলম্বাস এই জায়গাকে ভারতবর্ষ মনে করে এদেরকে ইন্ডিয়ান বলতে থাকেন। তাদের চেহারা ভারতীয়দের থেকে আলাদা এবং রং লাল থাকায় তিনি তাদেরকে রেড ইন্ডিয়ান বলে আখ্যায়িত করেন। এই আদিবাসীদের দেখার বাসনা আমার প্রথম থেকেই ছিল। আদিবাসীরা পাহাড়ে, জঙ্গলে থাকতে পছন্দ করে। নিউইয়র্ক বা কানেক্টিকাটে এদের কোন বিচরণ নেই তবে অনেকেই বলেছে এরিজোনা, টেক্সাস, কালিফোর্নিয়া অঙ্গ রাজ্যগুলি মেক্সিকান বর্ডারের পাশে থাকায় সেখানে আদিবাসিদের পাওয়া যেতে পারে। এরিজোনা ষ্টেটে এসে তাই আমি সব সময়ই এই রকম আদিবাসি অবয়ব খুঁজতে থাকি। আদিবাসিরা লম্বা, নাকটা একটু চেপটা হয় এবং চুলগুলো ঝাকালো। আমার দৃষ্টি তাই আদিবাসি কোথায় পাওয়া যায়। এরিজোনা ষ্টেটের চ্যান্ডলার শহরে এসে কোনো পরিচিত বাংলাদেশি পাচ্ছি না যাদের কাছে আমার ইচ্ছার কথাটা বলব। এই শহরে যে সকল বাংলাদেশী আছেন তারা সবাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে আসিন। এক ইন্টেলেই প্রায় ৮০ জন ইঞ্জিনিয়ার আছেন। তারা সবাই পিএইচডি হোল্ডার। আমার ছেলে দীপ এসেছে মাত্র দুই মাস হয়। এদের কারো সাথেই তার তেমন বন্ধুত্ব হয় নাই। তাই আদিবাসিরা কোথায় থাকে সেটাও জানা হয় না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করাকালীন একটিই টিভি চ্যানেল ছিল সেটা হচ্ছে বিটিভি বা বাংলাদেশ টেলিভিশন। বিটিভিতে একটা ছবি দেখাত ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েষ্ট। মাথায় হ্যাট, জিন্সের প্যান্ট, হাতে ছড়ি এরা দক্ষিণ আমেরিকা দাবিয়ে বেড়াত। যাদেরকে কাউবয় বলা হত। এরা কি আদিবাসি না এরাও অভিবাসি? সেটাও জানার বিষয়ে ছিল। আমি মনে করতাম আমাদের দেশের বাউলদের মত ঝাকালো চুল. লম্বা চওড়া মানুষদের দেখতে পাব কোনো জায়গায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে চ্যান্ডলার শহরের গিলা স্প্রিং আবাসিক এলাকায় হাঁটতে বের হলেই দেখা হত অনেকের সাথে। তাদের সাথে হাই, হ্যালো এই পর্যন্তই। কাউকে এই আদিবাসীদের কথা জিজ্ঞাসা করলে কে কি মনে করে সেটাও চিন্তা করি। একদিন আমার মত বয়ষ্ক একজনকে পেয়ে তার সাথে আলাপ জুড়ে দিলাম । আলাপে জানলাম তার আদি পুরুষরা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের উজবেকিস্তান থেকে এসেছেন। উজবেকিস্তানের বেশীর ভাগ মানুষ মুসলমান হলেও তারা খৃষ্টান। তার দাদা এক সময় সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের আশায় আমেরিকায় চলে আসেন। মিশিগান ষ্টেটে মোটর কোম্পানিতে চাকুরী করার সুবাদে এখানেই বিয়ে করে থিতু হয়ে যান। মিশিগানে প্রচন্ড ঠান্ডা। বছরের সব সময়ই ঠান্ডা থাকে। এই ঠান্ডা তার স্ত্রীর একদম সহ্য হয় না। তার স্ত্রী আবার ঠান্ডাজনিত রোগে ভুগেন। তাই এক সময় মিশিগান ছেড়ে এরিজোনাতে চলে আসেন। এখানকার আবহাওয়া সব সময় গরম। এই আবহাওয়ায় তার স্ত্রীর শরীর খুব ভাল থাকে। এখানে তিনি বাড়ি কিনেছেন। ছেলে মেয়েরা পার্শ্ববর্তী টেক্সাস ষ্টেটে চাকুরী করে। কালেভদ্রে বছরে হয়ত একবার আসে। স্বামী স্ত্রী দুজনেই সকালে দুটি কুকুর নিয়ে বের হন। নিজেরা হাঁটেন আর কুকুরকে টয়লেট করিয়ে বাসায় যান। এই দম্পত্তির সাথে প্রতিদিন একটি দুটি কথা বলে মোটামোটি সখ্যতা হয়ে গেছে। একদিন তাদেরকে বললাম আমার আদিবাসি দেখার খুব ইচ্ছা। তাদের কাছ থেকেই জানলাম শিক্ষিত আদিবাসিরা এখন বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে একাকার হয়ে গেছে। আবার অনেকেই আছেন পার্শ¦বর্তী দেশ মেস্কিকো, বলিভিয়া, পেরু, ব্রাজিল, ভেনিজুয়েলা ইত্যাদি দেশে বাস করেন। তবে আমেরিকার পাহাড়ি এলাকায় এখনও আদিবাসিরা আছেন তবে তারা শহরে আসেন কম। নিজেদের পরিমন্ডলে থাকতেই তারা পছন্দ করেন। এখনও তারা শিক্ষার আলোর বাইরে। কতই না বৈচিত্রে ভরা এই পৃথিবী। একদিকে মানুষ বসতবাড়ি করার জন্য হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আমেরিকায় এসে স্থায়ী আবাস তৈরী করছে আর অপরদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শীর্ষে উন্নত জাতির মূল বাসিন্দারা আধুনিক ছোঁয়া থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে। তিনি বললেন এক সময় পুরো আমেরিকাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আদিবাসিরা ছিল। ইউরোপীয়ানরা এদেশে আসার পর এই আদিবাসিরা এদেরকে দেবতা ভেবে ঠাই দিয়েছিল কিন্তু এক সময় তাদের ভুল ভাঙ্গে। ইউরোপীয়ানরা তাদের আবাস ভূমি দখল করে তাদেরকে বিতারিত করে। আদিবাসিরা আস্তে আস্তে লোকালয় ছেড়ে পাহাড়ে জঙ্গলে চলে আসে। এই কথাগুলো শুনার পর আমার আদিবাসি দর্শনের স্বপ্ন এখানেই আটকে যায়।
আমার ছেলে দীপ আমাদেরকে একদিন নিয়ে গেল কাউবয়দের গ্রাম বলে খ্যাত জড়ি যরফব বিংঃবৎহ ঃড়হি দেখতে। আমাদের চ্যান্ডলার শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে সেই গ্রাম। পুরো গ্রামটি আমেরিকার পর্যটন বিভাগের অধীনে। গ্রামে ঢুকতে হলে গেইটে টিকেট করে ঢুকতে হয়। দীপ অফিস থেকে বিকাল ৫ টায় এসেই বলল সবাই তৈরী হয়ে যান। আমরা একটা মজার শহরে যাব। গ্রামটিতে যেতে যেতে আমাদের প্রায় বিকাল ৬টা বেজে যায়। ভেতরে ঢুকেই প্রথমেই দেখতে পেলাম লম্বা সাদা দাড়ি, পরনে জিন্সের প্যান্ট, মাথায় হ্যাট পরনে একজন আমাদের স্বাগত জানালেন। আমি এই বয়ষ্ক কাউবয় এর সাথে ছবি তুলতে ভুল করলাম না। গ্রামটি অনেক লম্বা । দুই দিক দিয়ে দোকান পাঠ। মাঝ খান দিয়ে রাস্তা। তবে এখানে কোন যানবাহন চলে না। সবাই হেঁটে হেঁটে কাউ বয়দের গ্রাম দেখছেন। ঢুকার মুখেই দেখলাম একটা হলরুম, সেখানে কাউবয়দের এডভেঞ্চারভিত্তিক নাটক প্রদর্শিত হচ্ছে। ভিতর থেকে গোলাগোলির আওয়াজ, চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। আমাদের খুব ইচ্ছা এই প্রদর্শনী দেখার কিন্তু আমরা এসেছি অনেক পরে। সব টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। আজকে আর প্রদর্শনী হবে না। প্রায় দুই ঘন্টার এই প্রদর্শনী দেখতে না পারায় আফসোস করা ছাড়া আর কিছু ছিল না। কাউ বয়দের বাড়িগুলো দেখার মত। প্রথম দর্শনেই বুঝা যায় বাড়িগুলি তৈরী করার আগেই বহিরাগত শত্রুর কথা চিন্তা করা হয়েছে। মনে হয় আগামিতে যুদ্ধ আছে আর সেটার প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা নেওয়া হয়েছে। গ্রামে একটি বড় জেলখানা আছে। অপরাধীদের এই জেলে রাখা হত। ভেতরে অত্যন্ত শক্ত গাঁথুনিতে বিভিন্ন কুঠরি বানানো আছে। যাতে অপরাধীদের জেলে আনার পর পালিয়ে যেতে না পারে। কাউবয়দের অস্ত্র কারখানাটি আরো পরিপাটি। বন্দুক থেকে শুরু করে তলোয়ার, ডেগার, ভুজালি তারা নিজেরাই তৈরী করত। বনের হিং¯্র পশুর আক্রমণকে প্রতিহত করা সহ বহিরাগত শত্রুর সাথে যুদ্ধের জন্য নিজেদেরই অস্ত্র তৈরীর কারখানা ছিল । নিজেদের উদ্ভাবিত এত সুন্দর অস্ত্র তৈরী করার পদ্ধতি দেখে অভিভূত হলাম। পাহাড়, জঙ্গলে থাকতে হলে নিজেদেরকে তৈরী করে নিতে হয়। এটা কাউবয়রা স্থানীয় জ্ঞান থেকেই আহরণ করেছে। কাউবয়দের খাবারের ঘর, সেলুন এগুলো আলাদাভাবে সাজানো আছে। এক জায়গায় গিয়ে দেখলাম কাউবয়দের ঘোড়ার আস্তানা। সেখানে বড় বড় ঘোড়া চড়ে বেড়াচ্ছে। এই ঘোড়ায় চড়েই তারা এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াত। ঘোড়ার আস্তাবল বা থাকার জায়গাটি চমৎকার। আস্তাবলটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখতে পারদর্শী ছিল তারা তাই সেটাকে এভাবেই দেখানো হয়েছে। এক সময় কাউবয়দের ঘোড়াই ছিল বাহন। তারা খাদ্যের সন্ধানে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বের হত। বনে, জঙ্গলে পশু শিকার করত। নিজেদের সা¤্রাজ্য পাহারা দিত। তারা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। সরকার এদেরকে আইনের আওতায় আনতে অনেক সহায়তা দিতে হয়েছে। আমার মনে হল ভারতেও একই ভাবে সেভেন সিস্টারের পাহাড়িদের সরকারের নিয়স্ত্রণে রাখতে সরকারকে অনেক কিছুতে ছাড় দিতে হয়। ছাত্রাবস্থায় দেখা ডরষফ ডরষফ ডবংঃ ছবিটির সাথে সব কিছু যেন মনের পর্দায় ভাসছে। আদিবাসি না দেখতে পেলেও আজকে কাউবয়দের গ্রাম দেখতে পেরে পুলকিত হলাম।
(চলবে)


