‘আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। সমবায় আন্দোলন গড়ে উঠার পর সংশ্লিষ্টরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে সমবায় সমিতি নিয়ে অভিযোগ আসত না।’
‘মাইক্রোক্রেডিট বা ক্ষুদ্র ঋণের বোঝা নিয়ে হয় মানুষকে আত্মহত্যা করতে হচ্ছে, অথবা পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ঘর-বাড়ি, জমি-জমা বিক্রি করে মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। এভাবে মানুষ যাতে নিঃস্ব না হয় সেজন্য মাইক্রোক্রেডিটের পরিবর্তে মাইক্রোসেভিংসে আমরা যাচ্ছি।’
উপরের উদ্ধৃতি দুইটি জাতীয় সমবায় দিবসের অনুষ্ঠানে শনিবার দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার (দৈনিক সমকাল ৬ নভেম্বর ২০১৬ পৃ: ২) । উন্নয়নের দর্শন হিসাবে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের সংবিধানে তৃতীয় খাত হিসাবে সমবায় ব্যবস্থাপনাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সমবায় সমিতিসমূহের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাহীন দুর্নীতি ও সৃজনশীলতার অভাবের কারণে আজ সমবায় ব্যবস্থাটি একটি বিরাট প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এর প্রমাণ। সমবায় সমিতি নাম ধারণ করে ডেসটিনি অথবা বিভিন্ন ব্যাংক যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, অধুনা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির মাধ্যমে যেভাবে অমৎস্যজীবীরা জলমহালের নব্যপ্রভুত্ব অর্জন করছে, সেরকম অবস্থায় সমবায় পদ্ধতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাগুলো সংগত কারণেই গড়ে উঠছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এবং গ্রামীণ সুবিধাভোগী তথাকথিত সমবায়ীরা এর দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। অথচ দেশের কৃষি উন্নয়নে সমবায় পদ্ধতির সফলতা একেবারে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট ছিলো। বিশেষ করে মহাজনি ঋণ জাল থেকে কৃষকদের রেহাই দেওয়া, সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও কৃষিতে উন্নত উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড যে ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছিল তা ছিল মূলত সমবায় পদ্ধতির সফল প্রয়োগের ফলেই। এরপর জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের মাধ্যমে গ্রামের কোটি কোটি সম্পদহীন মানুষকে আত্মকর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে ওই প্রতিষ্ঠান জাতীয় ও দাতা সংস্থার অর্থায়নে। এরপর সমবায় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিতেও পরিবর্তন আসে। তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতির হাওয়ায় ভেসে রাষ্ট্র সমবায় ব্যবস্থাপনাকে অবজ্ঞা ও অবহেলা করা শুরু করলো। এই শতাব্দির প্রথম দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বৈশ্বিক নতুন মেরুকরণের ফলে বাংলাদেশে বিদেশি অনুদানপ্রবাহ কমতে শুরু করে। তখন সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়ভাবে তেমন আনুকূল্য দেয়া হয়নি। ফলে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোর শুকিয়ে মরা শুরু হয় ।
অন্যদিকে সমব্য়া প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে এই পদ্ধতির অনেক যুগান্তকারী সম্ভাবনা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে পড়ে। আমরা জানি, কৃষকদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য সরকার মুক্তা প্রকল্প নামে একটি পাইলট প্রকল্প বিআরডিবির মাধ্যমে আশির দশকে শুরু করেছিলেন। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এতে কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিশ্চিত ছিল। কিন্তু জড়িত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে ওই প্রকল্পের আওতায় ব্যাপকভাবে লোকসান হতে থাকে। গোদামের ধান চুরি হতে থাকে। এভাবে ওই প্রকল্পটি মাঠে মারা যায়। সমবায় দিবসকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী যখন জড়িতদের ব্যর্থতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন তখন নিশ্চয়ই এই অঙ্গনের সকলকে আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের সামনে নিজেদের দাঁড় করাতে হবে। কারণ আমরা মনে করি বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে সমবায় পদ্ধতির মাধ্যমে এখনও উন্নয়নের অনেক সুযোগ রয়েছে।
ক্ষুদ্র ঋণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। মূলত অনভিজ্ঞ কিছু মহিলার হাতে অল্প পরিমাণ টাকা তুলে দিলেই যে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি হয় না সেই বাস্তবতা বুঝার সময় এসেছে এখন। গ্রামে ক্ষুদ্র পূঁজি সরবরাহের পরিবর্তে দরিদ্র পুরুষ ও নারীদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা দরকার। যাতে করে মানুষ শ্রম বিক্রি করে দারিদ্রতা বিমোচনের সুযোগ পায়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয় সৃষ্টির মাধ্যমে তার মূলধন গঠন তথা আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
- বিশ্বম্ভরপুরে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দিনব্যাপী লোকালাইজেশন কর্মশালা
- মৃত্যু দিবস-একটি ছবি : অনেক স্মৃতি

