বিশেষ প্রতিনিধি
হাওর পাড়ে ঝুপড়ি ঘরে থাকা একই পরিবারের ৫ প্রতিবন্ধীর আর্তনাদ গত ১৫ বছরেও কেউ শুনেননি। জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের সুরমা নদী ও হালির হাওর পাড়ের হোসেনপুর গ্রামের আলী উস্তার ও মিনারা দম্পতির ৫ সন্তান জন্মগত ভাবেই প্রতিবন্ধী। ওই শিশুদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে ব্যবসা, হালের বলদ, স্ত্রীর গহনা-জমি-জমা বিক্রি করে এখন নিস্ব হয়ে গেছেন বাবা আলী উস্তার।
তিনি নিজেও প্যারালাইসড হয়ে বর্তমানে শয্যাশায়ী। আর স্ত্রী মানুষের বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে যা পান তাতে অসুস্থ স্বামী আর সন্তানদের মুখে ঠিকমত একবেলা খাবার জুটাতে পারছেন না, সেখানে স্বামী আর সন্তানদের চিকিৎসা করে সুস্থ করে তোলাটা তার কাছে এখন একটি দু:স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।
উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৭কি:মি: দূরে লালপুর বাজার থেকে সুরমা নদীর খেয়া পাড়ি দিয়ে হোসেনপুর গ্রামে গেলে সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, ওই গ্রামের উস্তার আলী ও মিনারা বেগম দম্পতির ১৫ বছর বয়সী সুহেল মিয়া, ১৩ বছরের রুবেল মিয়া, ৯ বছরের শিশুকন্যা সুমা বেগম, ৭ বছরের জুনেন মিয়া, ও সাড়ে ৩ বছর বয়সী শিশু সন্তান আলী আহমদ সহ একই পরিবারের ৫ সন্তান প্রতিবন্ধী হয়ে ঝুঁপড়ি ঘরে বিনা চিকিৎসায় িিদন কাটাচ্ছে।
সবার বড় ছেলে ১৫ বছরের সোহেল জন্মের পর থেকেই বাকপ্রতিবন্ধী, তার দুই পায়েও সমস্য, এক পায়ের হাড় ভাঙ্গা। শীতকালে শরীরের ত্বক ফেটে যায়। এ অবস্থায় টানা ৬ বছর বিভিন্ন চিকিৎসকের দারস্থ হয়েও তার অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নয়ন ঘটেনি। ওই ছেলে ঘরের কোণে থেকে থেকে মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে উঠেছে।
সোহেলের ২ বছর পর জন্ম নেয়া দ্বিতীয় সন্তান রুবেল মিয়া শ্রবন প্রতিবন্ধী। পরের সন্তান মেয়ে সুমা। সুমাও জন্মের পর থেকেই শ্রবণ ও বাকশক্তিহীন। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলে মা-বাবাই ভরসা। লোকজন দেখলেই ভয় পায়। দিনভর উপোস কাটে কখনো কান্নাকাটি করে। দু’বছর পর ওই দম্পতির কোলজুড়ে আসে আরেক শিশু সন্তান জুনেন মিয়া। তারও শ্রবণ শক্তি ও বাকশক্তি নেই।’ সবার ছোট সাড়ে ৩ বছর বয়সী আলী আহমদ ও তার সহোদর ভাই-বোনদের ন্যায় বাকশক্তি ও শ্রবণশক্তি হীন। কোলের এই শিশুটি প্যারাইলাইসড। মা অন্যের বাড়ি ঝিয়ের কাজ করতে চলে গেলে অসহায় পিতাই তাকে আগলে রাখেন’
জানা গেল, সন্তানদের চিকিৎসার জন্য ওই দম্পতি গত ১৫ বছর ধরে স্থানীয় মেম্বার , চেয়ারম্যান , উপজেলা চেয়ারম্যান, সমাজসেবা অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের দরজায় দরজায় বছরের পর বছর ধরে কড়া নাড়লেও সাহায্যের হাত বাড়ায়নি নি কেউ। এনজিও সংস্থা, দানশীল, বিত্তবান ও সমাজসেবক ব্যাক্তিদের কেউ-ই কোন দিন উঁিকও দেন নি হালির হাওর পাড়ের হোসেনপুর গ্রামের ওই ঝুঁপড়ি ঘরে পড়ে থাকা নিষ্পাপ শিশুগুলোর মুখের দিকে। তাকিয়েও দেখেনি কেউ কোনদিন।’
উস্তার আলী ও মিনারা দম্পতি এ প্রতিবেদকে জানান, প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসার ব্যায় মেটাতে গিয়ে বালি পাথরের ব্যবসা, গোয়ালের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, অলংকার, আবাদী জমি সহ প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ করেছেন কিন্তু একটি সন্তানও সুস্থ হয়নি।’ এখন অন্যের বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে মিনারা যা পান তাতে অসুস্থ স্বামী ও ৫ প্রতিবন্ধী সন্তানদের মুখে একবেলা ঠিকমত খাবারোও জুটাতে পারছে না ।
জামালগঞ্জ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন বলেন,‘ জামালগঞ্জ সমাজসেবা অফিস থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি ৬৮৭ জন প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেয়া হয় কিন্তু ওই তালিকায় গত ১৫ বছরেও ওই শিশুদের নাম উঠেনি।
জেলা সমাজসেবা অফিসার খান মোতাহের হোসেন বলেন,‘হোসেনপুরে একই পরিবারের ৫ প্রতিবন্ধী থাকার বিষয়টি আমার জানা নেই। তিনি জানান, ওই শিশুদের ব্যাপারে জামালগঞ্জ সমাজসেবা অফিস থেকে কেউ কিছই জানায় নি।’
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘৫ প্রতিবন্ধী শিশুর বিষয়টি আমি গণমাধ্যমের খবরে জানতে পেরেছি। যথাসাধ্য চেষ্টা করব ওদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য।’ তিনি আরো বলেন, জেলা সদরে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সম্প্রতি একটি বিদ্যালয় চালু করা হয়েছে, যদি ওই শিশুদের কেউ লেখাপড়া করতে চায় আমি নিজ উদ্যোগে সে ব্যবস্থাও করে দেব।


