গাইবান্ধায় উচ্ছেদকৃত সাঁওতালদের পুনর্বাসন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিন

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জে রংপুর চিনিকলের জমির দখলকে কেন্দ্র করে গত রবিবার পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে এ পর্যন্ত তিনজন সাঁওতাল মারা যাওয়ার খবর জানা গেছে। সাঁওতালদের দেড় হাজারের মতো বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতাল পরিবারগুলো বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের আশ্রয় নেই, কাজ নেই, খাবার নেই। এদিকে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের পাশের দুটি গ্রাম জয়পুর ও মাদারপুরে সাঁওতালরা একরকম অবরুদ্ধ অবস্থায় চরম আতঙ্কে রয়েছে। এক মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির চিত্রই উঠে আসছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে। অগ্নিসংযোগ-লুটপাটের সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি উচ্ছেদ হওয়া ও অবরুদ্ধ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার জরুরি ভিত্তিতে।
বিবিসি বংলায় ৮ নভেম্বর প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, স্থানীয় সাঁওতালদের দাবি- পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট চালানো হয়েছে এবং এ সময় পুলিশের গুলিতে দু’জন নিহত হয়েছে। তবে গুলি চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে প্রশাসন বলছে পুলিশের ওপর হামলার জবাবে তারা শক্তি প্রয়োগ করছে ঠিকই কিন্তু গুলি চালায়নি। তবে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা যে ঘটেছে তার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী একজন সাংবাদিক। তার ভাষ্য মতে, ঘরগুলোতে যে আগুন লাগানো হয়েছিল, সেটার ছাইয়ের স্তুপ এখনো আছে। সবগুলো ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিছু কিছু ঘরের জায়গা লাঙ্গল দিয়ে চাষ করে দেয়া হয়েছে। বিবিসির উল্লিখিত প্রতিবেদনেই নেপথ্যের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এভাবে যে, ১৯৫৬ সালে গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জ চিনিকলের জন্য প্রায় দুই হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে তৎকালীন সরকার। সেখানে তখন ২০টি গ্রামের মধ্যে ১৫টিতে সাঁওতালদের বসবাস ছিল। বাকি পাঁচটি গ্রামে বাঙালিদের বসবাস ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে গেলে সাঁওতালরা সে জমিতে আবারো ফেরত আসার চেষ্টা করে। সাঁওতালদের দাবি, জমি অধিগ্রহণের চুক্তিতে কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, অধিগ্রহণ করা জমিতে আখ চাষ ছাড়া অন্য কোনো কিছু করা যাবে না। ২০০৪ সালে চিনিকল বন্ধ হয়ে যাবার পর আখচাষের জন্য বরাদ্দ করা জমি অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এই যুক্তির ভিত্তিতে সাঁওতালরা তাদের পূর্ব-পুরুষের জমিতে ফিরে আসার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসের দিকে তারা সেখানে বসতি গড়ে তোলে। অপর পক্ষে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসকের বক্তব্য হলো, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়েই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, তাই সেখানে সাঁওতালদের ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই, রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে ভিন্নভাবে এই জমি ব্যবহার করতে পারে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সূত্রপাত, গুলিবর্ষণ-অগ্নিসংযোগ নিয়ে রয়েছে প্রশাসন ও সাঁওতালদের পরস্পর-বিরোধী বক্তব্য। পুলিশ বলছে, সাঁওতালরা আখ কাটতে বাধা দিয়ে পুলিশের ওপর তীর-ধনুক নিয়ে আক্রমণ করেছে। অন্যদিকে সাঁওতালরা বলছে, পুলিশের উপস্থিতিতেই তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ-লুটপাট চালানো হয়েছে; এই জমি থেকে তাদের উচ্ছেদের জন্য প্রশাসন অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছে।
যাই হোক, সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাঁওতালদের তিনজন মারা গেছে, কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে, বসতঘর পুড়ে যাওয়ায় অনেকগুলো পরিবার উদ্বাস্তু ও সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়েছে- এসব তথ্যের সত্যতা কারো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আর জয়পুর ও মাদারপুর গ্রামে সাঁওতালদের অবরুদ্ধ অবস্থায় আতঙ্কে দিনাতিপাত করার খবর প্রকাশিত হয়েছে গতকালের একটি জাতীয় দৈনিকেও। আমরা মনে করি বিশাল সংখ্যক প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত এই বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্বসহ বিবেচনা করা উচিত। সেখানে আর যেন হতাহতের ঘটনা না ঘটে সেটি প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে জমির অধিকার সংক্রান্ত বিষয়টি ফয়সালার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের দায়িত্বশীলদের। সাঁওতাল বসতিতে গুলি-অগ্নিসংযোগ-লুটপাটের ঘটনার অবশ্যই সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক বিচার হওয়া উচিত। আরো জরুরি হলো উদ্বাস্তু হয়ে পড়া সহায়-সম্বলহীন পরিবারগুলোর আশ্রয়, ত্রাণ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।