সাড়ম্বরে আয়োজিত বিএনপির কেন্দ্রীয় সম্মেলন থেকে দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্র শেষ অর্থে তেমন লাভবান হতে পারেনি বলেই মনে হয়। কিছু শ্রবণ সুখকর ঘোষণা ছাড়া আর শিক্ষণীয় কিছু দিতে স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছে এই সম্মেলন। দেশের অপরাপর প্রধান রাজনৈতিক দলের গতানুগতিক কাউন্সিল অধিবেশনের বাইরে স্বতন্ত্র কোন বৈশিষ্টমণ্ডিত ছিল না এই সম্মেলনের। সুতরাং একে নির্বাচন কমিশনে দলের নিবন্ধন ধরে রাখার জন্য বাধ্যবাধকতার একটি সম্মেলন ছাড়া অন্য কিছু বলার অবকাশ নেই। জাতি আশা করেছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে এবং গণতন্ত্রের জন্য ‘আন্দোলন-সংগ্রাম’ করার কারণে দলটির ভিতরে নতুন মূল্যায়ন, নতুন রাজনৈতিক দর্শন ও চিন্তার জন্ম নিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের ভার দলীয় প্রধানের উপর ছেড়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পুনর্বাসন কিংবা বিকশিতকরণ দলবিশেষের মূল লক্ষ্য নয়। বরং কেন্দ্রাভিমুখীতা, ব্যক্তিমুখীতা, আনুগত্য ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে রীতি আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো চর্চা করে চলেছে বিএনপি তার বাইরে যাওয়ার কোন ইচ্ছা পোষণ করে না।
বিএনপির এই সম্মেলনটি একটি অসাধারণ তাৎপর্যে মহিমান্বিত হতে পারত শুধু নেতৃত্ব নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চর্চা করলেই। কারণ এই সম্মেলনে দলটি গতানুগতিক রাজনৈতিক দর্শনের বাইরে যেয়ে কিছু নতুন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধি সমন্বয়ে পার্লামেন্টে উচ্চকক্ষ স্থাপন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গণভোটের ব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, ভিশন ২০৩০ উপস্থাপন ইত্যাদি সুচিন্তার পরিচয়বাহী বিষয় ছিল। কিন্তু এসব ভাল ভাল ঘোষণার পাশাপাশি যখন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টির ক্ষেত্রে একদেশদর্শী ঐতিহ্য বজায় রাখা হয় তখন আসলে এইসব ভাল কথা নিজের সারবত্তা হারিয়ে ফেলে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতিকে প্রধান অন্তরায়রূপে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। মোটমাট ক্ষমতায় ছিলেন কিংবা ভাগ পেতে পারেন এমন সব দলের ক্ষেত্রেই এই কথা প্রযোজ্য। এমন কি বামপন্থী চিন্তার জাসদও কয়েকদিন আগে যে কাউন্সিল করলেন সেখানেও আধিপত্যবাদী তৎপরতা দেখা গিয়েছে যার ফলশ্র“তিতে সংগঠনটি পুনর্বার ভাঙনের শিকার হয়েছে। জনগণকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যেসব রাজনৈতিক দলের তারা যখন এমন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকেন তখন জনগণ রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত হওয়ার পরিবর্তে উল্টো মানসিকতা রপ্ত করবেন। আমাদের জাতীয় বিকাশ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এটি অন্যতম অন্তরায় হিসাবে সিন্দবাদের ভূতের মতো চেপে বসে আছে। রাজনৈতিক দলের এমন মানসিকতার বদল না ঘটা পর্যন্ত দেশোন্নয়নে গৃহীত বড় বড় স্বপ্নগুলো বারবার হুছট খাবে। দুর্নীতির রাক্ষুসে মুখ আজ যে বিশাল পরিমাণ সম্পদ ও সম্ভাবনা গিলে খাচ্ছে সেই মুখ আরও অনেক বড় আকার ধারণ করবে। সংগঠন থেকে ব্যক্তি সর্বত্র আধিপত্যবাদী মনোভাবের বিকাশ ঘটবে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। এই গতি পাহাড়ি ঢলের মতো ভাসিয়ে নিবে মাঠের সোনালী ফসলসম যাবতীয় সম্ভাবনাকে।
রাজনীতি, রাজনৈতিক দল ইত্যাদি সবকিছুর পিছনে থাকেন কিছু মানুষ। মানুষ জন্মগত ও ঐতিহাসিকভাবে একইসাথে সৃজনশীল ও চরম ধংসাত্মক মনোভাবের অধিকারী। সভ্যতা সৃষ্টির বিভিন্ন বাঁকে মানুষের এই পরষ্পরবিরোধী বৈশিষ্টের পরিচয় মিলে। আমাদের প্রধান হিসাবে বিবেচিত যে রাজনৈতিক সংগঠন আজ নেতিবাচক বৈশিষ্ট দ্বারা আবৃত হয়েছে সেগুলোকে সৃজনশীল ধারায় ফিরিয়ে আনা মানবগোষ্ঠীরই এক ইতিহাস নির্ধারিত দায়িত্ব। আমরা সর্বাবস্থায় বিশ্বাস করি ১৫ কোটি জনঅধ্যুষিত মহান এই দেশের শুভবোধের মানুষেরাই রাজনীতির সবচাইতে সুন্দর রূপটি আবারও সকলের সামনে নিয়ে আসবেন।

